বারৈয়ারঢালা সহস্রধারা জলপ্রপাত সীতাকুন্ড

এপ্রিল ২, ২০১৭, ২:১৮ অপরাহ্ণ

সবুজ শর্মা শাকিলঃ সবুজের ছায়ায় ঘেরা পাহাড়ের উঁচুঁ টিলা বেয়ে অবিরাম গতিতে নিচে পড়ছে ঝরনার পানি। একটুও যেন থামার অবকাশ নেই। চারদিকে সবুজের পাহাড়ের এ অপরূপ দৃশ্য দেখলে মনে হয় যেন পাহাড় থেকে অশ্রু হয়ে অবিরাম পড়ছে জলপ্রপাত। এ ঝরনাটি গিরি সৈকতের অপূর্ব লীলাভূমি সীতাকু-ের মনোরম প্রাকৃতিক শোভাকে করে তুলেছে আরও অপরূপ। ছোট-বড় পাহাড়ের শ্যামল বনানীর কোলে পাখিদের কিচির-মিচির, বিচিত্র সাপের আনাগোনা, বন হরিণের চঞ্চল ছোটাছুটি, বানরের লাফালাফি, ভল্লুকের বাঁদুরঝোলা আর ভর সন্ধ্যায় শেয়ালের হুক্কাহুয়া-এই শ্যামল পাহাড়ের প্রাকৃতিক শোভাকে করে তুলেছে নৈসর্গিক কাব্যময়।
চারদিকে সবুজ পাহাড়, মাঝখানে পাহাড় থেকে অশ্রু হয়ে অবিরাম পড়ছে জলপ্রপাত। পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় জলপ্রপাতের অপরূপ দৃশ্য। যে দৃশ্য দেখার জন্য দেশের বিভিন্নস্থানের সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ অনায়াসেই ছুটে আসতে পারেন এ পর্যটন স্থান বারৈয়ারঢালা সহস্রধারা জলপ্রপাতে। সীতাকু- পৌরসদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে বারৈয়ারঢালা পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়ঝরা সহস্রধারা। ৩০০ ফুট উঁচু একটি পর্বত শীর্ষ থেকে জলধারা শিলাময় স্থানে পতিত হয়। এত উঁচু পাহাড় থেকে এভাবে যুগ যুগ ধরে জলপ্রপাতের ধারাটি নিচে যাওয়ার ফলে এখানে বিশাল কূপের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃতির নৈসর্গময় অপরূপ শোভা আপনাকে মহুর্তেই সব ক্লান্তি ও হতাশা থেকে মুক্তি দেবে। সহস্রধারার আকর্ষণীয় দিকগুলোর কথা এতদিন যারা শুধু শুনেছেন তারা সরাসরি দেখলে বুঝতে পারবেন এর আকর্ষণ কত বেশি।

পর্যটকদের জন্য মনোমুগ্ধকর স্থান সীতাকু-ের বারৈয়ারঢালা সহস্রধারা জলপ্রপাতটি । পাহাড়ি উঁচু-নিচু দুর্গম টিলার পথ পাড়ি দিয়ে পেঁৗছাতে হয় এ সহস্রধারায়। জন্মলগ্ন থেকেই পাহাড়ি ঝরনাটির চারদিকে আছে বিরাট বিরাট পাথরের স্তূপ। ঝরনাধারার স্বচ্ছ পানি দিয়ে নানা জাতের সবজি ফলিয়েছে এলাকার চাষিরা।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, এটি লবণাক্ষী ঝরনা নামেও খ্যাত। কারণ ঝর্ণাটি থেকে ৫০ গজ দূরে পুরাকীর্তি সজ্জিত মন্দিরে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। তাই সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজন এটিকে চন্দ্রনাথ তীর্থধামের একটি অংশ মনে করে। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসে কৃষ্ণপক্ষে শিবচতুদর্শী পূজায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা চন্দ্রনাথ মন্দির দর্শন শেষে এই সহস্রধারার লবণাক্ষ মন্দির দর্শনে সমাবেত হয়। আশির দশকের পর থেকে ধীরে ধীরে এ জলপ্রপাতটি ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে একটি আকর্ষণীয় পিকনিক স্পট হিসেবে জনপ্রিয় হয়।
প্রতিবছরই অসংখ্যক পর্যটক প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এখানে ছুটে আসে। শীত মৌসুমে দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এখানে আসার জন্য কোনো ফি লাগে না। কৈফিয়ত দিতে হয় না কাউকে। তবে এ জলপ্রপাত দেখতে আসা পর্যটকরা সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত নয়। এখানে নেই নিরাপত্তার ব্যবস্থা। প্রকৃতির ছায়া ছাড়া কোনো বিশ্রামাগার নেই। দীর্ঘ পাঁচ কিলোমিটার পাহাড় পথ পাড়ি দিতে হয় অথচ আহারের কোনো ব্যবস্থা নেই।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের কেউ কেউ মারাত্মক বিপদের কথা ভুলে দুর্গম টিলা বেয়ে উঠে পড়েন পানি নির্গমের স্থানটি দেখার জন্য। আর তাতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতির জন্য সতর্কতামূলক বাণী লিপিবদ্ধকরণ বা সাইনবোর্ড স্থাপনসহ সার্বক্ষণিকভাবে এখানে একাধিক নিরাপত্তাকর্মীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
পর্যটকরা মনে করেন, জলপ্রপাতের নিচে সৃষ্ট জলাশয়ের স্থানটি এতই সংকুচিত যে সেখানে এক সঙ্গে বেশি মানুষ চলাচল করতে গেলে প্রতিনিয়তই নানা অসুবিধার মুখে পড়েন-বিষয়টি সমাধানে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। বারৈয়াঢালার জলপ্রপাতটি দেখে চট্টগ্রাম থেকে আসা সাংবাদিক বিশ্বজিত পাল খুবই আনন্দিত। তিনি জানান, ‘এখানে এত সুন্দর অপরূপ দৃশ্য আছে সেটা অনেকে জানে না। সবচেয়ে কষ্টকর হচ্ছে, পাহাড়ের পাদদেশে ছরা বেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে জলপ্রপাতটি দেখতে পর্যটকরা ভিড় করবে।’
সীতাকু- উপজেলায় একটি আয়ুর্বেদিক ঔষধ কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বপালন করা দিনাজপুরের দিলীপ কুমার রায় বলেন, স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে শুনতে পেয়ে স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে নিয়ে এ জলপ্রপাতটি দেখতে এসেছি। জলপ্রপাতটি দেখে আমরা খুবই মুগ্ধ। তবে অাঁকা-বাঁকা গহীন অরণ্যের মধ্যে শিশু ও মহিলাদের নিয়ে দেখতে যাওয়া খুবই কষ্টকর। এখানে পর্যটন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
বারৈয়ারঢালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেহান উদ্দিন রেহান জানান, ‘প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা বারৈয়ারঢালা সহস্রধারা অবহেলিত পড়ে রয়েছে। চিরসবুজ সহস্রধারাটি একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রার্থী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, তেমনি দেশের প্রাকৃতিক বনজ সম্পদের এক অমূল্য ভা-ার। আমার বিশ্বাস এ সহস্রধারা জলপ্রপাতটির প্রতি সরকার একটু সুদৃষ্টি দেয় তাহলে এটি পর্যটকদের কাছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে আর্কষণীয় পর্যটন স্থান হিসেবে চিহ্নিত হবে। প্রকৃতির এ নৈর্সগিক মনোমুগ্ধকর শোভা দেখতে ছুটে আসবেন দেশ-বিদেশের পর্যটক ও দর্শনার্থীরা।’

পড়া হয়েছে ১৯২ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ