মধ্যবিত্তের ঠিকুজির খোঁজ

জুন ১১, ২০১৭, ২:৪০ অপরাহ্ণ

সমাজের বড় একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যবিত্ত মনে করে থাকে। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে থেকে বড় ভূমিকা রাখে এরাই।

বাজেট ঘোষণার পর কিংবা অন্য কোনো কারণে পণ্য বা সেবার দাম বাড়লে বলা হয় ‘চাপে পড়বে মধ্যবিত্ত’। কিন্তু এই মধ্যবিত্ত কারা? সংজ্ঞা কী মধ্যবিত্তের? সংখ্যাই বা কত এদের? সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে এ ধরনের প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। গত ৪৬ বছরেও বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বিচ্ছিন্নভাবে মধ্যবিত্ত নিয়ে গবেষণা করার চেষ্টা করেছে, তবে তা কেবলই আর্থিক পরিমাপ দিয়ে। সামাজিক অবস্থান, মানবিক মূল্যবোধ, আধুনিক ধ্যানধারণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ অন্য বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিস্তর পর্যালোচনা হয়নি।অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন মানুষ দৈনিক দুই হাজার ১২২ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করলে কিংবা দৈনিক আয় ১ দশমিক ৯২ ডলারের কম হলে তাকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দারিদ্র্যসীমার এই সংজ্ঞা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাঁদের মতে, শুধু অর্থ উপার্জনের দিক বিবেচনা করে মধ্যবিত্তের মানদণ্ড নিরূপণ করা ঠিক হবে না। আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক মর্যাদা, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধাকেও মানদণ্ডে আনতে হবে।

মধ্যবিত্ত কারা—দেশের অন্তত ২০ জন অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীর কাছে জানতে চাইলে তাঁরা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, যারা নির্ধারিত আয়ের মানুষ, মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কাজ করে, যাদের বেতনের বাইরে বাড়তি আয় নেই, উচ্চবিত্ত বাদ দিয়ে দারিদ্র্যসীমার ওপরে যাদের বসবাস, তারাই মধ্যবিত্ত।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার কত এবং কারা মধ্যবিত্ত—তা নিয়ে বছর দুয়েক আগে একটি গবেষণা করেছিলেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন। তাঁর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে এখন মধ্যবিত্তের হার মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ। ১৯৯১ সালে এ হার ছিল ৯ শতাংশ।

বিবিএস থেকে জনসংখ্যার হালনাগাদ তথ্য নিয়ে বিনায়ক সেন বলেছেন, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি। এর মধ্যে ২০ শতাংশ বা চার কোটি মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে। তিনি পূর্বাভাস দেন, বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার যেভাবে বাড়ছে, এটি অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে এ হার ২৫ শতাংশে আর ২০৩০ সালে ৩৩ শতাংশে উন্নীত হবে।

মধ্যবিত্ত সম্পর্কে বিনায়ক সেন বলেছেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন ব্যক্তির ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি)। দৈনিক দুই থেকে তিন ডলার পর্যন্ত আয় করলে তাকে মধ্যবিত্তের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়; যদিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা হলো দুই থেকে ১৩ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সংজ্ঞা উপযোগী নয়।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের হার নিয়ে এডিবি এক যুগ আগে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি গবেষণা করেছিল। তাতে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে তখনকার জনগোষ্ঠীর তিন কোটির ওপরে মধ্যবিত্ত ছিল। ২০০৫ সালের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে দৈনিক দুই থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত যারা খরচ করতে পারে, তাদের মধ্যবিত্ত হিসেবে ধরা হয়েছে।

বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, দেশে এখন পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ শ্রমশক্তিতে জড়িত আছে, যাদের মাসিক গড় আয় ১৩ হাজার টাকা। অবশ্য তারা যে মধ্যবিত্ত, সরাসরি সেটা বলছে না বিবিএস। বিবিএসের জরিপে বলা হয়েছে, তারা চাকরি করে। মাস শেষে বেতন পায়। তবে এই শ্রমশক্তিতে ব্যবসায়ীদের আনা হয়নি। সাত বছর আগে একটি জরিপ করেছিল বিবিএস, যেখানে মধ্যবিত্তের হার বলা হয়েছিল ৫৪ শতাংশ। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নেহাল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মধ্যবিত্ত বলতে তাদেরই বুঝি, যারা নিদেনপক্ষে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে। তাদের কোনো জৌলুস নেই। বেতন যা পায় তা দিয়েই চলে যায়। ’ তাঁর মতে, ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণি হবে বেতনভুক্ত। তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকবে না। নিজস্ব বাসস্থান থাকবে না। থাকলেও সেটা থাকবে সাদামাটা। নিম্নবিত্ত বলতে বোঝানো হবে, যারা নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না। ’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার নিজস্ব একটি বিশ্লেষণ আছে। তা হলো ১০০-এর মধ্যে ১ থেকে ২০ পর্যন্ত যাদের অবস্থান, তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ২১ থেকে ৪০ পর্যন্ত যারা, তারা নিম্ন মধ্যবিত্ত। ৪১ থেকে ৬০ পর্যন্ত শ্রেণিতে যারা আছে তারা মধ্যবিত্ত। আর ৬১ থেকে ওপরে যারা আছে তারা উচ্চবিত্ত। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেশে ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ (৪১-৬০) মধ্যবিত্ত। সংখ্যায় তারা তিন কোটি। ’

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, মধ্যবিত্ত বলতে তাদেরই বোঝায়, যারা দারিদ্র্য সীমারেখার ওপরে অবস্থান করছে। যারা দৈনিক দুই হাজার ১২২ কিলোক্যালরি কিংবা দৈনিক ১ দশমিক ৯২ ডলারের কম আয় করে, তারা দরিদ্র। এই হার এখন ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১৬ কোটি মানুষের চার কোটি মানুষ দরিদ্র। এই দারিদ্র্যসীমার ওপরে যারা বসবাস করে তারা মধ্যবিত্ত।

ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা শুধু মাথাপিছু আয় দিয়ে ধরা ঠিক হবে না। আয় ছাড়াও জীবনমানের অন্য সব বিষয়ও আনতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা সঙ্গে আনতে হবে। মধ্যবিত্তের একটা সাংস্কৃতিক মানদণ্ডও থাকা উচিত। মধ্যবিত্তের জীবনে ঝুঁকি আছে। হঠাৎ নদীভাঙনের কারণে যেকোনো মধ্যবিত্ত শ্রেণি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে এখন মধ্যবিত্তের সংখ্যা দেড় কোটি। প্রতিবছর ২০ লাখ করে মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে যুক্ত হচ্ছে। গবেষণাটি তারা করেছে বাংলাদেশিদের ভোগ্যপণ্য কেনার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, ‘মধ্যবিত্ত আমরা তাদেরই ধরব, যারা নির্ধারিত আয়ের প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থাৎ মাস শেষে বেতন পায়। বেতনের বাইরে বিকল্প আর কোনো আয়ের সুযোগ নেই। সন্তানের স্কুল খরচ ও স্বাস্থ্য খরচ বেড়ে গেলে যাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, তারাই সমাজে মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত তারাই যারা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে বসবাস করে। ’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষক রওনক জাহান বলেন, যাদের আয় মাঝামাঝি এবং যারা মাসওয়ারি আয় করে, সমাজে তারাই মধ্যবিত্ত। যারা মাসওয়ারি বেতন পায় না, তাদের মধ্যবিত্তের কাতারে ফেলা মুশকিল। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মনে করেন, যাদের ন্যূনতম থাকার জায়গা আছে, খাওয়াদাওয়ার জন্য কারো কাছে হাত পাততে হয় না, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারছে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে—তাদের মধ্যবিত্তের কাতারে ফেলা যেতে পারে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরীর মতে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্যবসা করবে না, চাকরি করবে। যারা তাদের সন্তানকে স্কুলে পড়াতে পারছে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে এবং সাংস্কৃতিক একটা অবস্থান আছে, তাদের মধ্যবিত্ত হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ই-জার্নাল অব সোসিওলজির (ভলিউম ১৪, সংখ্যা ১) জানুয়ারি ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মধ্যবিত্তের মধ্যে ব্যবসায়ীদেরও রেখেছেন। মধ্যবিত্তকে তিনি তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। প্রথমত, পেশাজীবীদের মধ্যবিত্ত (চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, চিত্রশিল্পী ও গণমাধ্যমকর্মী)। দ্বিতীয়ত, বেতনভোগী মধ্যবিত্ত (সরকারি কর্মচারী, অধ্যাপক, কলেজ ও স্কুল শিক্ষক, ব্যাংক-করপোরেট-এনজিও কর্মকর্তা, কারখানা বা বায়িং হাউসের ব্যবস্থাপক)। আর উদ্যোক্তা, খুচরা বিক্রেতা, দোকান মালিক, ছোট শিল্প মালিকদের ব্যবসায়ী মধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি (সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যাঁদের নৈকট্য রয়েছে) বলে আরেকটি ধাপের উল্লেখ রয়েছে এ নিবন্ধে। তাঁর মতে, উচ্চ মধ্যবিত্তরা ক্রমে উচ্চবিত্তের স্তরে উন্নীত হবে। আর আয়ের বিবেচনায় শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকে আলাদা করা কঠিন হবে নিম্ন মধ্যবিত্তদের। কারণ এখন ফুটপাতের হকার বা ট্যাক্সিচালকের আয়ও গড়পড়তা স্কুল শিক্ষক ও নিচের ধাপের কর্মকর্তার চেয়ে বেশি।

কালের কন্ঠ

পড়া হয়েছে ১৯৯ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ