এখন বাংলাদেশ ভারত মানে…

জুন ১৩, ২০১৭, ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের অবস্থা এখন জেরেমি করবিনের মতো। নির্বাচনে হার-জিত যা-ই হোক, করবিনই মানুষের কাছে বিজয়ী।

পত্রপত্রিকা আর টিভিতে এত গুণকীর্তন যে মাঝেমধ্যে ভুল হয়। তিনিই প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন নাকি! বাংলাদেশ এখন যেমন। সেমিফাইনালে যা-ই ঘটুক না ঘটুক, বাংলাদেশ এখন বিজয়ীর বেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বার্মিংহামে। বাংলাদেশি সমর্থক তো বটেই এমনকি ভারতীয়দের কাছেও জয়ী দলের নাম বাংলাদেশ! তরুণ ভারতীয় সমর্থক অখিল যেমন বলছিল, ‘সেমিফাইনালে আমরা জিততেই পারি কিন্তু রিয়াল উইনার তোমরা। কেউ তো ভাবেইনি অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের গ্রুপ থেকে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে চলে আসবে। ’আর ভারতের অবস্থা খানিকটা টেরেসা মের মতো যেন। নির্বাচনে জিতেও যে কোনো নেতা বা নেত্রী এমন তোপের মুখে থাকতে পারেন, সেই অভিজ্ঞতাও এখানে এসে হলো। সব জায়গায় এক সুর—তুমি যাও। কবে যাবে! পরশু বেচারি গিয়েছিলেন রবিবার দিনের নিয়মিত গন্তব্য চার্চে। ট্যাবলয়েড পত্রিকায় তাঁর বিরাট ছবি ছাপিয়ে যা লেখা হয়েছে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তার মানে দাঁড়ায়—যতই প্রার্থনা করো, তোমার দিন শেষ। ভারত সেমিফাইনালে উঠেছে, প্রত্যাশামতো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই, তবু শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ধসে যাওয়াটা এমন একটা কালি লাগিয়ে দিয়েছে যে ভাবটা এমন যেন সেমিফাইনালে উঠলে কী হবে, নিজেদের দিনে তো যে কেউ তোমাদের হারাতে পারে। এমন আর কি হাতি-ঘোড়া দল তোমরা! গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েও ভারত যেন কিছু একটা অপরাধ করে এসেছে। গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে, মাত্র এক ম্যাচ জিতেও যেন বাংলাদেশ যা করেছে সব ঠিক। পাল্লায় দুই ক্রিকেটীয় প্রতিপক্ষ ম্যাচের আগে সমতায় না থেকে এভাবেই দাঁড়ায়, যখন ম্যাচটা শুধু ক্রিকেট না থেকে অন্য কোথাও পৌঁছায়। যখন ম্যাচে ঢুকে পড়ে ক্রিকেটীয় সমীকরণ ছাপানো মনস্তত্ত্ব, আবেগী মানুষের উন্মাতাল অঙ্ক, বিভেদ লেগে থাকা ভূগোলের মানচিত্র।

মাত্র দুই ঘণ্টার দূরত্বে যে লন্ডন তারই এক প্রান্তে ওভাল মাঠে ক্রিকেটের এক চরম রোমান্টিসিজমের জন্ম হয়েছিল। আদতে বিষাদ কাহিনি; কিন্তু ইতিহাস নিজের খেয়ালে একে বরণ করে দিয়েছে রোমাঞ্চের রং মাখিয়ে। অ্যাশেজের কথা বলছি। কিন্তু দেড় শ বছরেরও পুরনো আভিজাত্যমাখা লড়াইটাও পেছনে পড়ে যায় যখন ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট মাঠকেই বানাতে শুরু করে বিকল্প যুদ্ধক্ষেত্র। সীমান্তে যুদ্ধ চলে, সেখানে ঠিক মীমাংসা হয় না বলে ব্যাটে-বলেই অঙ্ক মেলানো। বহুকাল দুনিয়া বিভক্ত হয়েছিল এই যুদ্ধোন্মাদনায়। অ্যাশেজ এখন প্রায় জাদুঘরে গিয়ে ঢুকেছে। আর ভারতের বাজারের কাছে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের আত্মসমর্পণে ভারত-পাকিস্তানও তেজ হারিয়ে এখন হারানো দিনের গল্প যেন। প্রকৃতি নাকি শূন্যতা পছন্দ করে না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই একের পর এক ধাপ ফেলে চলছে বাংলাদেশ-ভারত লড়াই। একেকটা ম্যাচ হয় আর যোগ হয় নতুন নতুন মসলা। রুবেল হোসেনের বলে রোহিত শর্মা আউট হওয়া সত্ত্বেও আম্পায়ার ‘নো’ ডেকে তাঁকে বাঁচিয়ে দেন, ধোনি মুস্তাফিজকে ধাক্কা দিয়ে উত্তেজনার আরো রসদ জোগান, মুশফিকরা জয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে অদ্ভুতুড়ে পাগলামিতে লড়াইয়ের ইতিহাসে বিষাদ আর হাহাকার যোগ করেন। শিহরণ-ক্ষোভ-আফসোস-হাহাকার মিলে তৈরি হয় এমন এক পর্দা, যাতে অদৃশ্যে লেখা ক্রিকেটের নতুন যুদ্ধ বাংলাদেশ বনাম ভারত। এবার ভারতের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতেই কেন যেন মনে হয়েছিল হয়ে যাবে! যখন একটা লড়াইয়ের ধারা জমতে থাকে তখন হাওয়া যেন পবিত্র দায়িত্ব পালনের মতো তাতে আগুন জোগানোর কাজ করে। তাই সব অঙ্ক মিলে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়ে যায় ভারত-বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে এই ম্যাচ বাংলাদেশকে সেমিফাইনাল খেলতে দেয়নি। এবার বদলার সুযোগ! কেউ বদলার কথা বলেন না। মাশরাফি না। কথা ওঠাতে তামিম বললেন, ‘যে-ই আসুক, সবাই সমান। কোনো পার্থক্য তো দেখি না। ’ কিন্তু অনুচ্চারে উত্তেজনার অন্য রকম আওয়াজ ভেসে চলে।

ভূমিকা রেখে চলে মানচিত্রও। বাংলাদেশের সাধারণ জন-আবেগে একটা ভারতবিরোধিতা আছে। আমাদের রাজনৈতিক জটিলতার কুিসত ব্যবহারে জিনিসটা নোংরা চেহারা নেয়; কিন্তু এটা তো ঠিক, পৃৃথিবীর যেকোনো জায়গায় প্রতিবেশীদের মধ্যে খেলার লড়াইয়ে বাড়তি বারুদ থাকেই। কিছু অমীমাংসিত বিষয় থাকে, বছরের পর বছর এর মীমাংসা হয় না বলে এখানেই অঙ্কটা মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ। আর ছোট প্রতিবেশী হলে তো কথাই নেই। বঞ্চনাবোধ থাকে। শক্তির জোরে অবিচারের শিকার হওয়ার একটা দুঃখবোধ থাকে। সেই দুঃখবোধের সঙ্গে ক্রিকেটীয় দুঃখও যোগ হয়, যখন বাংলাদেশ দেখে ভারতের বাণিজ্যের শক্তির কারণে আর দশজনের মতো সে-ও বঞ্চিত। সেই বঞ্চনায় অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের খুব কিছু আসে-যায় না, কারণ তাদের মানুষের আবেগে অতটা ক্রিকেট নেই। কিন্তু আমাদের কাছে ক্রিকেট জীবনের অন্য নাম হয়ে ওঠাতে এই জায়গাতেও ভারত আরেকবার প্রতিপক্ষ। ও হ্যাঁ, লড়াই এই জায়গাতেও। কারণ এ দুই দেশেই ক্রিকেট মানুষের কাছে ধর্মের মতো। নইলে ইংল্যান্ডের পত্রিকাগুলো এখন ব্যস্ত হ্যারি ক্যানকে নিয়ে, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচ ড্র করায় তিনিই নায়ক। এর আগে শুরুতে এসে দেখেছিলাম আর্সেন ওয়েঙ্গার। তুলনায় ক্রিকেটের নিখোঁজ থাকা দেখতে দেখতে মাঝেমধ্যে মনে হয় খেলাটা আসলে এখন উপমহাদেশের, আরো সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশ আর ভারতের। সেই দুই দল যখন ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে শামিল হয় তখন আবহে যুদ্ধ-যুদ্ধ রেশ থাকে। সেই রেশের মধ্য দিয়েই ক্রিকেট জেগে থাকে। বেঁচে থাকে।

খেলছেন না, পরের ম্যাচেও যে খুব সম্ভাবনা আছে এমন নয়। তবে বাংলাদেশ দল যা করে ‘রোটেশন পদ্ধতিতে’ একেক দিন একেকজনকে পাঠায়। কাল সেই হিসাবে আসা শফিউল জানালেন, ভারত কিংবা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই দল তৈরি আছে। তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে পেস বোলিং ছকই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সম্ভবত। কাল বাকিরা যখন বিশ্রাম নিয়েছেন বা ঘুরে বেড়িয়েছেন যে যাঁর মতো তখন এজবাস্টনে প্র্যাকটিসে গিয়েছিলেন শুধু পেসাররা। বার্মিংহামের উইকেটে আগে পাকিস্তানের সঙ্গে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলে গেছে বলে দলের সে সম্পর্কে ধারণা আছে, কাজেই উইকেট বা মাঠও নতুন বা অপরিচিত নয়। যেটা ভারতও এই মাঠটাকে খুব ভালো জানে। পাকিস্তানকে বিরাট ব্যবধানে এখানে হারিয়ে গেছে ওরা। আর বাংলাদেশি সমর্থকরা যতই বার্মিংহামে ছড়িয়ে থাকুক, সংখ্যা বলছে এখানে বাংলাদেশিদের চেয়ে ভারতীয়দের সংখ্যা দ্বিগুণ। আগের তিন ম্যাচের মতো গ্যালারির দখল নেওয়া তাই বোধ হয় সম্ভব হবে না। লড়াই করতে হবে সেখানে। এই যে সমর্থকদের লড়াই, তাতে আমাদের দর্শকরা মাঝেমধ্যে সীমা ছাড়ায়। সেদিন এক আড্ডায় কেউ একজন তামিম ইকবালকে সেটা বলছিল। তামিম প্রসঙ্গটার সঙ্গে একমত নন। বললেন, ‘আমাদের দর্শকদেরটা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু ওদিকেও কম হয় না। ’ ঠিক, এখন ওদিকেও কম হয় না। এখনো এটাকে বাংলাদেশের মতো জীবন-মরণ লড়াই মনে না করলেও ভারতীয়রা ধীরে ধীরে দেখছে বাংলাদেশ ঠিক একটা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠছে। মাঠে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। চোখে-চোখ রেখে তাকায়। সমর্থকরা ইটের জবাবে পাটকেল ছোড়ে!

বার্মিংহাম এমনিতে পাকিস্তানিদের শহর বলে গণ্য হয় এশিয়ানদের কাছে। পৃথিবীর অল্প কিছু শহরের মধ্যে এটা একটা, যেখানে ভারতীয়দের চেয়ে পাকিস্তানি বেশি। এখানেই জেমস ওয়াট বাষ্প ইঞ্জিন তৈরি করে সভ্যতাকে নতুন দিগন্ত দেখিয়েছিলেন। এখন চ্যাম্পিয়নশিপে নেমে গেলেও এই শহরের ক্লাব অ্যাস্টন ভিলার প্রতিষ্ঠাতাই ইংলিশ ফুটবল লিগেরও প্রতিষ্ঠাতা। ব্রায়ান লারা এখানেই ৫০১-এর অতিমানবীয় কীর্তিটা করেছেন। বব উলমার তাঁর ক্রিকেটীয় মস্তিষ্ক ধারালো করেছেন এখানকারই কাউন্টি ওয়ারউইকশায়ারের কোচ থাকার সময়। আবার এই শহরটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এমন আক্রান্ত হয়েছিল যে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে বহু বছর লেগেছে। শহরটার আরো বড় বৈশিষ্ট্য ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পার্ক বা উদ্যান এখানে, সংখ্যাটা ৫৭১। বার্মিংহামের এসব ইতিহাস-ঐতিহ্য মাথায় রেখে নেমে পার্ক-বাগান খুঁজছি যখন, তখন সবার আগে চোখ পড়ল একটা সাইনবোর্ডের দিকে।

কী লেখা জানেন? রয়েল বেঙ্গল টাইগার। শহরের কেন্দ্রে রকমারি দোকান, চীন-জাপান-ভারতীয়-ব্রিটিশ কিন্তু তাঁর মধ্যেও সবচেয়ে জ্বলজ্বলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আর কালকের দিনে এটা খুব মানিয়েও যাচ্ছিল।

বলছিলাম না, বাংলাদেশের অবস্থা এখন করবিনের মতো। ফল যা-ই হোক, করবিনের মতো বিজয়ীর বেশে বার্মিংহামের বাংলাদেশ।

 

পড়া হয়েছে ৬৬৬ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ