খুব কি দরকার ‘সহায়ক’ সরকার?

জুলাই ৩, ২০১৭, ৫:১৫ অপরাহ্ণ
বিভুরঞ্জন সরকারঃ ২০১৩ সালে বিএনপির দাবি ছিল তত্ত্বাবধারক সরকার। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়। এটাই ছিল তাদের দাবির মূল কথা। সরকার সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করেছিল। বিএনপির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পক্ষের বক্তব্য ছিল: যে বিধান সংবিধানে আর নেই, সে বিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার সুযোগও আর নেই। নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনেই হবে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেমন হয়। বিএনপি কোনোভাবেই সরকারের অবস্থান মেনে নিতে পারছিল না। তারা মনে করছিল, তাদের পরাজিত করার জন্যই সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখোখুখি অবস্থানে দাঁড়ায়। বিএনপির ধারণা ছিল, যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি রাজনৈতিক, নাগরিক সমাজ এবং দেশের এক বড় সংখ্যক মানুষের সমর্থন আছে সেহেতু এই দাবি না মেনে সরকারের উপায় নেই।
বিএনপি তাদের দাবির প্রতি অবস্থান যত দৃঢ় করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারও ততই এর বিরুদ্ধে শক্ত হওয়ার নীতি নিয়েছে। বিএনপিকে একটুও ছাড় না দিয়ে সরকার তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। দুই পক্ষের অনড় ও অনমনীয় অবস্থানের কারণে দেশের রাজনীতিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পর্যায়ক্রমে তা হয়ে ওঠে সংঘাতময়। বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে অনেক আন্দোলন করেছে। আন্দোলনের নামে সহিংসতা করেছে, জীবন ও সম্পদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সরকার পিছু হটেনি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলে সরকার নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায়। বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। খালেদা জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেন। টেলিফোনে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন।  তা সত্ত্বেও সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন শেখ হাসিনা। স্বরাষ্ট্র  মন্ত্রণালয়সহ বিএনপির পছন্দ অনুযায়ী আরো মন্ত্রণালয় বিএনপিকে অফার করা হয়। কিন্তু বিএনপি গোঁ ধরে থাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। বিএনপিকে ছাড়াই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীসহ বিএনপি জোটের সমর্থকরা ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে, নির্বাচন কর্মকর্তাকে হত্যা করে এবং শত শত স্কুলঘর পুড়িয়ে দিয়েও নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অবশ্যই সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়নি। কিন্তু ওই নির্বাচনের কোনো বিকল্প সরকারের সামনে ছিল না। নির্বাচনটি বিতর্কিত হয়েছে। এই সান্ত্বনা পুরস্কার নিয়ে বিএনপি রাজনীতির মাঠে খোঁড়া ঘোড়ার মতো আচরণ করে চলেছে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ক্ষমতায় বসে সরকার মেয়াদ পূরণ করতে পারবে না বলে বিএনপি আশা করলেও তাদের সে আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে। বিএনপি এখন না ঘরকা না ঘাটকা। এই অবস্থায় আর একটি নির্বাচনের হাতছানি বিএনপির সামনে। কী করবে বিএনপি?
অনেক মাশুল দিয়ে তারপর বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছে। এবার তাদের দাবি—  ‘সহায়ক’ সরকার। খালেদা জিয়াসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তাই নির্বাচনে সহায়ক সরকার তারা চায়। কেমন হবে এই সহায়ক সরকার তার কোনো রূপরেখা বিএনপি দেয়নি। মাসখানেকের মধ্যে নাকি দেবে। বিএনপির থিংক ট্যাংক  এনিয়ে কাজ করছেন। কী ডিম তারা পাড়েন সেটা দেখার অপেক্ষা এখন রাজনৈতিক মহল ও দেশবাসীর। তবে বিএনপি সূত্র উল্লেখ করে কোনো কোনো গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে সরকারের বাইরে রেখে অথবা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা কমিয়ে সহায়ক সরকার গঠন করা যেতে পারে বলে বিএনপি ভাবছে। বিএনপির সহায়ক সরকারের প্রস্তাব আওয়ামী লীগ গোড়া থেকেই নাকচ করে আসছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি খারিজ করেছিলেন যে যুক্তিতে, সহায়ক সরকারের বিরোধিতাও করছেন সেই একই যুক্তিতে। তাদের কথা, সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ সরকারের নেই। সংবিধানে সহায়ক সরকার বলে কিছু নেই। নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে। আবার বিএনপির শীর্ষ নেতারা বেশ জোর দিয়েই বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। সহায়ক সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন হবে। সহায়ক সরকারের ব্যাপারে এই জোর বিএনপি কোথায় পাচ্ছে? সেটা কেউ বুঝতে পারছে না। বিএনপির দাবি মানার মতো অবস্থা ও মনোভাব আওয়ামী লীগের নেই। আবার আন্দোলন করে দাবি আদায় করার শক্তি বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির নেই। বিএনপির বরং উচিত হবে যে কোনো পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া।
নিজেদের জনপ্রিয়তার ওপর যদি বিএনপির পরিপূর্ণ আস্থা থাকে তাহলে তাদের উচিত হবে নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তাতে অংশ নেওয়া। কোনো দল বা প্রার্থীর অনুকূলে গণজোয়ার সৃষ্টি হলে তার সামনে ষড়যন্ত্র, নীলনকশা, ভোট কারচুপির পরিকল্পনা— কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। মানুষ যদি বিএনপিকে ভোট দিতে মনস্থ করে তাহলে কোনো সরকারি মেকানিজম তাদের হারাতে পারবে না। কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সেটা দেখেছে। বিএনপি যদি নিশ্চিত হয়ে থাকে যে দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায় এবং সে পরিবর্তন বিএনপির পক্ষে তাহলে নির্বাচনে না যাওয়ার কোনো উছিলা বিএনপির খোঁজা উচিত হবে না। বিএনপি আসলে কী চায় সে ব্যাপারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। ভালো নির্বাচনের জন্য সহায়ক সরকার খুব জরুরি বা অপরিহার্য মনে করে জেদ ধরে বসে থাকলে আরেকটি ট্রেন মিস করার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঈদের পরদিন বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। নির্বাচনকালে শেখ হাসিনার সরকারই সহায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে। এটাই আমাদের সংবিধানের নিয়ম।’ এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি এই নিয়ম মানবে কি না? খালি মাঠে আওয়ামী লীগকে গোল দিতে না দেওয়ার যে-কথা বিএনপি নেতারা বলেন, সেটাই যদি তাদের প্রকৃত অবস্থান হয় তাহলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হবে না। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ অবশ্য সবাইকে আশ্বস্ত করে ঈদের পর সরকারি অফিস খোলার দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আপনারা ডায়েরিতে লিখে রাখুন। আমি নিশ্চিত করে বলছি, প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেবেন।’ যদি তাই হয় তাহলে দেশের মানুষ  সত্যি স্বস্তি বোধ করবে।
লেখক :সাংবাদিক
সূত্রঃ ইত্তেফাক

পড়া হয়েছে ১২৫ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ