বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক; নৈসর্গের হাতছানি

অক্টোবর ১৬, ২০১৫, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ

নাগরিক ব্যস্ততায় হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ মাঝে মাঝেই চান একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে। হারিয়ে যেতে চান কোন এক নৈসর্গিক সবুজ-শ্যামলিমার মাঝে। হ্যাঁ, নৈসর্গিক সবুজ আর নানা রকম বন্যপ্রাণী দেখতে আর তাদের সাথে সময় কাটাতে আমাদেরও ছুটে চলা।

গন্তব্য ঢাকার খুব কাছেই ‘বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক,গাজীপুর।’ গাড়ি ছুটে চলল। ইট, কাঠ, পাথর আর কংক্রিট এর শহর পেরিয়ে সবুজের আবাহনে। ঢাকার খুব কাছে হওয়াতে ঘণ্টা দু’য়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম (তবে জ্যাম বিবেচনায় রেখে)।গাড়ি থেকে নামতেই পার্কের বিশাল গেট আর দুই পাশে বিশালাকৃতির হাতির অবয়ব আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত।

ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক। এর পাশেই বাঘের বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নে এই পার্কের অবস্থান। খন্ড খন্ড শাল বনের ছোট বড় বনভূমি মিলিয়ে ৩,৬৯০.০ একর এলাকা বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্কের আওতাভুক্ত। ভাওয়াল গড়ের ছোট ছোট টিলা ও নিচু ভূমি (বাইদ) সমৃদ্ধ শালবন এলাকায় গড়ে তোলা হয় এই পার্ক। ২০১০ সালে পার্কের কাজ শুরু হয়। আর ২০১৩ সালে পূর্ণাঙ্গ সাফারি পার্ক হিসেবে চালু করা হয়। তবে এটি থাইল্যান্ডের সাফারী ওয়ার্ল্ড এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি।

এবার পার্কের ভিতরে প্রবেশ করা যাক-

এই সাফারি পার্কটি ৫টি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। ১. কোর সাফারি পার্ক। ২. সাফারি কিংডম। ৩. বায়োডাইভার্সিটি পার্ক। ৪. এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি পার্ক। ৫. বঙ্গবন্ধু স্কয়ার।

কোর সাফারি:
এখানে গাড়ি ছাড়া কোনও পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন না। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে দুটি জিপ ও দুটি মিনিবাস। পর্যটক বা দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে গাড়ি বা জিপে করে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে রাখা বন্যপ্রাণী দেখতে পারবেন।

১২১৭ একর ‘কোর সাফারী’ পার্কের মধ্যে ২০ একরে বাঘ, ২১ একরে সিংহ, ৮.৫০ একরে কালো ভাল্লুক, ৮ একরে সিংহ, ৮.৫০ একরে কালো ভাল্লুক, ৮ একরে আফ্রিকান চিতা, ৮১.৫০ একরে চিত্রা হরিণ, ৮০ একরে সাম্বার ও গয়াল, ১০৫ একরে হাতি, ৩০ একরে মায়া ও প্যারা হরিণ আছে। আফ্রিকান সাফারি পার্কের জন্য বরাদ্দ ২৪০ একর। যার মধ্যে বাঘ, সিংহ, সাদা সিংহ, জেব্রা, জিরাফ, ওয়াল্ডিবিস্ট, অরিক্স, ব্ল্যাক বাক, ভাল্লুক ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী। গাড়ির ভিতর থেকেও বাঘ, সিংহ কিংবা জিরাফকে সহজেই ক্যামেরা বন্দি করতে পারবেন।  বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক মাছ এর চিত্র ফলাফল


সাফারি কিংডম:
৫৫৬ একরের মধ্যে তৈরি করা এই অংশে ঢুকতেই নজর কাড়বে ম্যাকাও ল্যান্ড। এখানে আছে নীল-সোনালি ম্যাকাও, সবুজ ম্যাকাও, টিয়া, আফ্রিকান গ্রে প্যারট, পেলিকেন, লুটিনো রিংনেক প্যারটসহ প্রায় ৩৪ প্রজাতির পাখি। এর সবগুলোই আফ্রিকা থেকে আনা । ম্যাকাও ল্যান্ডের পাশেই মেরিন অ্যাকুরিয়াম। এখানে রয়েছে প্রায় ২০ প্রজাতির মাছ। ক্রোকোডিল ফিস, টাইগার ফিস, লুকিয়ে থাকা ব্ল্যাক গোস, অস্কার। রয়েছে চিকলেট মাছ যা ২০ সেকেন্ড পর পর রং পরিবর্তন করে।

এছাড়াও রয়েছে প্রজাপতি সাফারি। যেখানে প্রায় ২৬ প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে। সাফারি কিংডমে রয়েছে  ফ্যান্সি কার্প গার্ডেন, জিরাফ ফিডিং স্পট, আইল্যান্ড, বোটিং ও লেইক জোন।
তাছাড়া অর্কিড হাউজ, শকুন ও পেঁচা কর্নার, এগ ওয়ার্ল্ড, ক্যাঙারু, হাতি শো গ্যালারি, প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্রসহ আরও অনেক কিছুই।

এছাড়াও সাফারি কিংডমের একটি  অংশে আলাদাভাবে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল তিনটি পাখিশালা। ধনেশ পাখিশালায় রয়েছে প্রায় আট প্রজাতির পাখি। এরইমধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির প্যারট, ফিজেন্ট ধনেশ, ফ্লেমিংগো, ব্ল্যাক সোয়ান ও বিরল প্রজাতির মান্ডারিন ডাক ছাড়া হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্কয়ার:
পার্কের প্রবেশ পথে পার্কিং এলাকা, বিনোদন উদ্যান ও প্রশাসনিক কাজে ৩৮ একর এলাকা নিয়ে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রধান ফটকের সামনে রয়েছে বিশাল পার্কিং এলাকা। এখানে নির্মাণ করা হয়েছে আকর্ষণীয় ম্যুরাল ও মডেলসহ প্রধান ফটক, ফোয়ারা, জলাধার ও লেক। আছে তথ্যকেন্দ্র, পার্ক অফিস, ডরমেটরি, বিশ্রামাগার, নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম, ঐরাবতী বিশ্রামাগার, ময়ূরী বিশ্রামাগার, ইকো-রিসোর্ট, ডিসপ্লে ম্যাপ, আরসিসি বেঞ্চ ও ছাতা।

এছাড়াও রয়েছে দুটি বিশাল আকার পর্যবেক্ষণ রেস্তোরাঁ, একটির নাম টাইগার রেস্তোরাঁ অপরটি সিংহ পর্যবেক্ষণ রেস্তোরাঁ। এই দুটো রেস্টুরেন্টে বসেই কাচের মধ্যে দিয়ে সিংহ এবং বাঘ দেখতে দেখতে খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে পারেন। আমরাও এর ব্যাতিক্রম নই। সাফারি পার্কের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে মনের ক্ষুধা মিটলেও পেটের ক্ষুধা মিটানোও দরকার।
এই পার্কে রয়েছে বিরল প্রজাতির কিছু বন্য প্রাণী, যেগুলো কখনও এশিয়া অঞ্চলে সচরাচর দেখা যায় না। এগুলোর মধ্যে  আল পাকা, ক্ষুদ্রকায় ঘোড়া, ওয়ালাবি, ক্রাউন ক্রেইন, মান্ডারিং ডাক ইত্যাদি।

পার্কের বেষ্টনীতে অবমুক্ত করা আছে হাতীও। শুধু দেখে কি আর মন ভরে, এবার হাতীর পিঠে চড়ে বসার পালা। বিশালকায় হাতীর উপরে চড়ে ঘুরে বেড়াতে মাহুত আপনাকে দিবে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা।

সাফারি পার্কের এই সবকিছু নিয়েই আমরা এক ফাঁকে কথা বলে নেই এখানকার তত্ত্বাবধায়ক নাজমুল হুদা মঞ্জুর সাথে। তিনি বলেন, ‘দর্শনার্থীদের জন্য নিজ উদ্যোগে বিরল প্রজাতির অনেক পশুপাখি এখানে নিয়ে আসি।’

তিনি আরোও বলেন, “পর্যাপ্ত সহযোগিতা পেলে এই পার্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবো। এরই মধ্যে বেশকিছু বিরল প্রজাতির, মিনি হর্স, আলপাকা, ক্রাউন ফিজেন্ট, ক্যাঙারু প্রজনন করতে সক্ষম হয়েছে এখানে।”

৩৬৯০ একর বিশাল আয়তনের এই পার্ক উপর থেকে দেখার জন্য রয়েছে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। চাইলে উপরে উঠে এক ঝলক দেখে নিতে পারেন।

পার্কে প্রবেশ ফি:
প্রাপ্ত বয়স্ক জন প্রতি পার্কে প্রবেশ টিকেট ৫০ টাকা এবং ১৮ বয়সীদের নিচে প্রবেশ ফি ২০ টাকা। শিক্ষা সফরে আসা বা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা।
গাড়িতে করে কোর সাফারি পার্ক পরিদর্শন প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রতিজনের টিকিট ফি ১শ’ টাকা। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা।
প্যাডেল বোট ভ্রমণ ৩০ মিনিট ২শ’ টাকা। বাস পার্কিং ২শ’ টাকা। মিনি বাস বা মাইক্রোবাস পার্কিং ২শ’ টাকা। গাড়ি বা জিপ পার্কিং ৬০ টাকা। অটোরিকশা বা সিএনজি পার্কিং ৬০ টাকা।

যেভাবে যাবেন:
ঢাকার মহাখালী থেকে গাজীপুরগামী যেকোনো বাসে যেতে পারেন। গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে বাঘের বাজার গেলেই চোখের পড়বে সাফারি পার্কের বিশাল সাইনবোর্ড। বাঘের বাজার থেকে সাফারি পার্কের দরজা পর্যন্ত যেতে রিকশা ও অটোরিকশা পাওয়া যায়। ভাড়া নিবে ৫০ থেকে ৭০ টাকা।

গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে বাঘের বাজার পর্যন্ত যাওয়ার জন্য রয়েছে হিউম্যান হলার। ছুটির দিন ও সাধারণ দিন হিসেবে ভাড়া মান নির্ভর করে। ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
এছাড়া ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাতায়াত করা বাসে করেও বাঘের বাজার সরাসরি নামা যায়।

সূত্রঃ সময়, ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে নেয়া।

পড়া হয়েছে ২৫৩৯ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ