ফরহাদ মজহার সম্পর্কে আদালতে যা বলেছেন অর্চনা

জুলাই ১২, ২০১৭, ১২:৫০ অপরাহ্ণ
 

ফরহাদ মজহারের বিষয়ে আদালতে সাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে আলোচনায় এসেছেন এক নারী। অর্চনা নামের ওই নারী আগে ফরহাদ মজহার ও তার স্ত্রী ফরিদা আখতার পরিচালিত বেসরকারি সংস্থা উবিনীগ-এর কর্মী ছিলেন। সোমবার (১১ জুলাই) ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম সত্যব্রত শিকদারের আদালতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে অর্চনা সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।

এ বিষয়ে জানার জন্য মঙ্গলবার অর্চনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন, তাও জানা সম্ভব হয়নি।

অর্চনার জবানবন্দির বিষয়ে জানতে ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে তাকেও পাওয়া যায়নি। অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ফরিদা আখতারের মোবাইল ফোন রিসিভ করে একটু পরে ফোন করতে বলেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পশ্চিম) গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, ‘আমরা ফরহাদ মজহারের অপহরণের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় যা করার তাই করা হচ্ছে।’ সাক্ষীদের জবানবন্দি এই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে সহায়ক হবে বলেও জানান তিনি।
আদালতে দেওয়া অর্চনার জবানবন্দি সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে যে তথ্য  এসেছে:

অর্চনা তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমার বাড়ি মঠবাড়িয়ায়। বাবার সঙ্গে ঝগড়ার কারণে পিরোজপুর শহরে মামার বাড়িতে চলে আসি আনুমানিক ২০০৫ সালের শেষ দিকে। ২০০৬ অথবা ২০০৭ সালের মাঝামাঝি ফরহাদ মজহারের এনজিও উবিনীগে চাকরি পাই। ২০০৭ সালের দিকে আমি চাকরি পেলে ১৫ দিনের ট্রেনিংয়ের জন্য টাঙ্গাইলে যাই। সেখানে ট্রেনিং শেষে আমি কক্সবাজার ব্রাঞ্চে যোগদান করি। কক্সবাজারে চাকরির সময়ে ফরহাদ মজহারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। এরপর আমি ঈশ্বরদীতে বদলি হয়ে আসি। সেখানে থাকাবস্থায় আমি ফরহাদ মজহারের ভক্ত হই। তার কাছে দীক্ষা নেই। তাকে ‘গুরুবাবা’ বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে ফকির ও বৈষ্ণব আদর্শে অনুপ্রাণীত করেন।

অর্চনা বলেন, ‘একবছর পর টাঙ্গাইলে বদলি হই। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার… আমাকে চাকরি থেকে বের করে দেন। চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার পর ফরহাদ মজহারের সঙ্গে আমার মোবাইলে যোগাযোগ হতো। এরপর বর্তমান বাসায় গুরুবাবা মাঝে মাঝে আসতেন। … গুরুবাবা মাঝে মাঝে আমার প্রয়োজন মোতাবেক ১০/১২ হাজার করে টাকা দিতেন। অসুখ-বিসুখ হলে বেশি টাকা দিতেন।… আমি ভাটারা এলাকায়  টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত-তরকারি সরবরাহ করেও টাকা আয় করতাম।’

অর্চনা বলেন, ‘১৬/৪/২০১৭ ইং তারিখ … গুরুবাবার কাছে টাকা চাই। গুরুবাবার কাছে টাকা না থাকায় তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। ০৩/০৭/২০১৭ ইং তারিখ সকাল ৬টা ২০ মিনিটে গুরুবাবা ফোন করে আমাকে জানান, তোমার টাকা সংগ্রহের জন্য বাহির হয়েছি। চিন্তা করো না। ০৩/০৭/১৭ ইং তারিখ সকাল ১১টায় আমি গুরুবাবাকে মোবাইল ফোনে জিজ্ঞাসা করি, আপনি অপহৃত হয়েছেন কিনা? তিনি আমাকে বলেন, কোনও সমস্যা নাই। আমি ভালো আছি। এরপর সন্ধ্যা ৭ টার দিকে গুরুবাবা আমাকে মোবাইল করে একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর চান। তখন আমি তাকে ডাচবাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর পাঠাই। তিনি আমাকে দুটি নম্বর থেকে ১৫ হাজার টাকা পাঠান। আমার কাছে জিজ্ঞাসা করেন, টাকা পেয়েছি কিনা? আমি বাসায় এসে মোবাইল ফোন চেক করে টাকা পাওয়ার কথা জানাই। পুনরায় তিনি আমাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন, আমি খেয়েছি কিনা? ভক্তি দিয়েছি কিনা? তিনি কথা বলার পর ফোন কেটে দেন। ০২/০৭/২০১৭ তারিখ গুরুবাবার সঙ্গে মোট ২-৩ বার কথা হয়। ০৩/০৭/২০১৭ তারিখ গুরুবাবা মোট ৫-৬ বার ফোন করেন। আমি ২-৩ বার ফোন করি। এরপর আমি ০৪/০৭/১৭ ইং বিকাল ৬ টায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় আমার আত্মীয় রবি সমাদ্দারের শ্বশুড়বাড়ি বেড়াতে যাই। ০৯/০৭/১৭ তারিখে ডিবি পুলিশ আমাকে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের সহায়তায় ঢাকা নিয়ে আসে। পরে পুলিশ আমার বাসা হতে মোবাইল ফোন ও ডায়েরি উদ্ধার করে। এই আমার জবানবন্দি।’

উল্লেখ্য, গত (৩ জুলাই) ভোর সোয়া ৫টার দিকে রাজধানীর আদাবর রিং রোড এলাকার হক গার্ডেনের নিজ বাসা থেকে বের হন ফরহাদ মজহার। এরপর একটি সাদা মাইক্রোবাসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। বিষয়টি তিনি স্ত্রী ফরিদা আখতারকে মোবাইলে জানান। এরপর আরও অন্তত পাঁচ বার তিনি স্ত্রীর কাছে ফোন করে মুক্তিপণ হিসেবে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে দিনভর দেশজুড়ে আলোচনা চলতে থাকে। ফরিদা আখতারের মৌখিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির সাহায্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারেন ফরহাদ মজহারকে গাবতলী, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, যশোর হয়ে খুলনার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুলনা থেকে ঢাকায় আসার পথে ফরহাদ মজহারকে যশোরের নওয়াপাড়ায় হানিফ বাস থেকে উদ্ধার করে। ৪ জুলাই তাকে ঢাকায় আনার পর আদালতে নেওয়া হলে তিনি ১৬৪ ধারায় ভিকটিম হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনায় ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার বাদী হয়ে সোমবার (৩ জুলাই) রাতেই আদাবর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্তভার প্রথমে আদাবর থানা ও পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 সুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

পড়া হয়েছে ১৩১ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ