একটি আদর্শ ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

আগস্ট ৩, ২০১৭, ২:০৮ অপরাহ্ণ

আজকাল খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কিত কথা উঠলেই যে পরামর্শটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তা হলো, ‘কম খান’ বা ‘চর্বি জাতীয় খাবার কমান’। কিন্তু শুধু আমি না আরো অনেকেই এই জাতীয় পরামর্শে কনভিন্সড না। আমাদের বেশিরভাগই হয়তো সাংঘর্ষিক পুষ্টি এবং খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কিত পরামর্শ শুনে কিছুটা হতবিহ্বলও বটে।

কিন্তু আমার মনে হয়েছে না দেহকে কোনো খাদ্য থেকে বঞ্চিত করাটা পুরোপুরি সঠিক সমাধান নয় বরং খাবার খাওয়ায় ভারসাম্য স্থাপনই আসল সমাধান। স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপনের জন্য সঠিক ধরন এবং সঠিক পরিমাণের খাবার খাওয়াটাই জরুরি।

ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস কেমন হতে পারে?
এমন খাদ্যাভ্যাস যার মাধ্যমে আপনি আপনার দেহকে তার প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে পারবেন। এর মধ্যে রয়েছে বড় পুষ্টি উপাদান যেমন, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেটস, এবং ফ্যাট। এবং ছোট পুষ্টিউপাদান যেমন, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান। প্রতিটি উপাদানই আমাদের দেহের ভিন্ন ভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে।
এই পুষ্টি উপাদানগুলো আসে প্রধান পাঁচটি খাদ্যগোষ্ঠী থেকে- ফল ও সবজি, শস্য এবং ডাল, মাংস এবং দুধ এবং চর্বি ও তেল। কিন্তু প্রতিদিন কী পরিমাণে খেতে হবে এই খাবারগুলো? প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেটস খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কখন এবং কী পরিমাণে খেতে হবে?

১. কার্বোহাইড্রেটস
আমাদের খাবারের ৭০-৮০% ক্যালোরি আসে শস্য ও ডাল জাতীয় খাদ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেটস থেকে।

অথচ কার্বোহাইড্রেটস থেকে আমাদের চাহিদার ৫০% ক্যালোরি আসা উচিত। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটস গ্রহণ করি বেশি। যেমন রুটি, বিস্কিট, সাদা চাল এবং আটা-ময়দা এসব বেশি খাই। কিন্তু এসব ছাড়াও কার্বোহাইড্রেটের আরো স্বাস্থ্যকর উৎস আছে। যেমন, পূর্ণ শস্য- লাল চাল, ভুট্টা এবং যব আরো বেশি স্বাস্থ্যকর কার্বোহাড্রেটের উৎস।এসবে রয়েছে প্রচুর খাদ্য আঁশ। আঁশ ছাড়া খাবার অসম্পুর্ণ থেকে যায়। কারণ এটি খাবার হজমে সহায়তা করে। কিন্তু খুব কম মানুষই যথেষ্ট পরিমাণে আঁশজাতীয় খাবার খায়।

বেশিরভাগ ফল, সবজি এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারই রক্তে হঠাৎ করে সুগারের হার বাড়িয়ে দেয় না। বরং তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। সুতরাং প্রতি ৩০ গ্রাম শস্যজাতীয় খাবারের সঙ্গে ১০০ গ্রাম সবজি খাওয়া উচিত।

সকালের নাশতায় খাদ্য শস্য বা কলা অথবা ভালো কোনো কার্বোহাইড্রেটের উৎস থাকতে হবে। যাতে দুপুরের খাবার পর্যন্ত আপনার দেহ সক্রিয় থাকে।

কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ না দিয়ে বরং পরিমাণ এবং গুনগত মানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে। সরল কার্বোহাইড্রেট যেমন, গ্লুকোজ এবং ফ্রুকটোজের উৎসগুলো হলো- ফল, সবজি এবং মধু; সুক্রোজের উৎস চিনি আর ল্যাকটোজের উৎস দুধ।

আর জটিল পলিস্যাকারাইড এবং শ্বেতসার পাওয়া যায় চাল ও গম জাতীয় শস্য, ভুট্টা, ডাল এবং মুলজাতীয় সবজিতে। এবং গ্লাইকোজেন পাওয়া যায় পশু খাদ্যে।

প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কতটুকু ক্যালোরি গ্রহণ উচিৎ:
পুরুষ: ২৩২০ কিলোক্যালরি/প্রতিদিন
নারী: ১৯০০ কিলোক্যালরি/প্রতিদিন

২. প্রোটিন
প্রতিদিনের খাবারের ৩০-৩৫% হওয়া উচিত প্রোটিন। ডাল, দুধ, পাতাবহুল সবুজ সবজি, ডিম, সাদা মাংস বা উদ্ভিজ্য উৎস থেকে আসতে পারে এই প্রোটিন। আমাদের দেহকোষ, চুল, ত্বক এবং সফট টিস্যুর কোষগুলোর প্রধান উপাদান প্রোটিন। আর তাছাড়া প্রোটিন হজমে বেশি ক্যালোরি খরচ হয়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি দরকার হয় প্রোটিন।

আমাদের প্রতিবেলা খাবারেই প্রোটিন থাকা জরুরি। ডাল, কটেজ পনির, আটা-ময়দা বা ৩০ গ্রাম ডাল হতে পারে আমাদের এই প্রোটিনের উৎস। আমাদের দেশের মানুষেরা প্রয়োজনের তুলনায় প্রোটিন অনেক কম খায়। কারণ আমাদের দেশে ধান-চালই বেশি হয়।

প্রতিদিন একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের কতটুকু প্রোটিন দরকার:
পুরুষ: ৬০ গ্রাম/প্রতিদিন
নারী: ৫৫ গ্রাম/প্রতিদিন

৩. ফ্যাট বা চর্বি: এটি শক্তি সরবাহ করে, ভিটামিন সংরক্ষণ করে এবং হরমোন সংশ্লেষণ করে। একজন মানুষের প্রতিদিনের খাবারে পাঁচ ভাগের একভাগ বা ২০% ফ্যাপট বা চর্বি থাকা উচিত। এই ফ্যাট তিন ধরনের- পলিআনস্যাচুরেটেড, মনোস্যাচুরেটেড এবং ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। প্রতিদিনের রান্নায় যে ভেজিটেবল তেল ব্যবহার করি আমরা তা আমাদের খাদ্যের দৃশ্যমান প্রধান উৎস। এর জন্য নানা ধরনের তেল ব্যবহার করা যায়। আপনি চাইলে মাখন, ঘি, অলিভ অয়েল, সরিষার তেল, সয়াবিন, তিলের তেল এবং এমনকি বাদাম তেলও খেতে পারেন। আর পরিশোধিত তেলের চেয়ে বরং ঘানিতে ভাঙ্গানো অপরিশোধিত তেলই বেশি ভালো।

৪. ভিটামিন ও খনিজ পুষ্টি
পরিপাকতন্ত্র, স্নায়ু এবং মাংসপেশির কার্যক্রম, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং কোষ উৎপাদনে সহায়ক এই মাইক্রোনিয়েট্রিয়েন্টস বা ছোট পুষ্টি উপাদানগুলো।

খনিজ পুষ্টি অজৈব পুষ্টি উপাদান। ফলে উদ্ভিদ, মাংস এবং মাছ থেকে খনিজ খুব সহজেই দেহে প্রবেশ করে। ভিটামিন হলো ভঙ্গুর যৌগ উপাদান। বাদাম, তেলবীজ, ফল এবং সবুজ শাক-সবজি তেকে আসে ভিটামিন। ভিটামিন এ, ই, বি১২ এবং ডি হলো মানবদেহের জন্য সবচেয় জরুরি। এছাড়া ক্যালসিয়াম এবং আয়রনও দরকার।

সুস্থ থাকতে প্রতিদিন অন্তত ১০০ গ্রাম সবুজ শাক-সবজি এবং ১০০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত।

এছাড়া খনিজ পুষ্টির উৎস হিসেবে প্রতিদিন পানি খেতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে। প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি খাওয়া দরকার।

নারীদের বেশিরভাগই আয়রণের ঘাটতি ও রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হন বলে গর্ভাবস্থায় তাদের পরিপূরক ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন এবং বায়োটিন ডোজ নেওয়া উচিত নিয়মিতভাবে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কী পরিমাণ ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত:
(১০০ গ্রাম দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য)
পুরুষ: ৬০০ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন
নারী: ৬০০ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কী পরিমাণ আয়রণ গ্রহণ করা উচিত:
পুরুষ: ১৭ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন
নারী: ২১ মিলিগ্রাম/প্রতিদিন

দেহকে সক্রিয় রাখার জন্য প্রতিদিন অন্তত তিন বেলা বড় খাবার খাওয়া উচিত। আর সকালের নাশতাতেই সবচেয়ে বেশি খাবার খাওয়া উচিত। অথচ আমরা সকালের নাশতাতেই সবচেয়ে কম খাই! আবার দুপুরের খাবারও আমরা তাড়াহুড়ো করে সেরে ফেলি। ফলে রাতের বেলায় গিয়ে সব খাবারের ভিড় জমে। অথচ রাতের বেলাতেই সবচেয়ে কম পরিমাণ খাবার খাওয়াটাই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি! কিন্তু সময় এসে গেছে পরিবর্তনের। আজই এই বদভ্যাসগুলো বদলে ফেলুন।

নাশতা
সকালের নাশতায় অন্তত তিনটি জিনিস থাকা উচিত। ১. খাদ্য আঁশ বা কার্বোহাড্রেটস (পূর্ণ-শস্য রুটি, ওটমিল, সাদা ওট, হুইট ফ্লেকস), ২. প্রোটিন (ডিম, দই, দুধ এবং মঁজরি) এবং ২. ভিটামিন (কাজুবাদাম, আখরোট, অ্যাপ্রিকোট, এবং ফিগ)।

দুপুরের খাবার
উচ্চ আঁশযুক্ত পূর্ণ খাদ্য শস্য যেমন লাল চালের ভাত, বার্লি বা জোয়ার (যব), শ্বেতসারবহুল কার্বোহাইড্রেটস এবং কটেজ পনির, ডাল, মুরগীর মাংস বা মাছের মতো প্রোটিনের ভালো কিছু উৎস। এর সঙ্গে যুক্ত করুন কিছু প্রোবায়োটিক যেমন দই বা ঘোল এবং আঁশের উৎস সবজির সালাদ।

রাতের খাবার
রাতের খাবারটি যেন উচ্চ মাত্রায় তৃপ্তিদায়ক। রাতের খাবারে প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাক-সবজি খান যাতে আপনার দেহের ভিটামিন এবং খনিজ পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণ হয়। রাতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে দিলেও একেবারে বাদ দিয়ে দেবেন না যেন। এর সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎসও যোগ করতে পারেন। যেমন. মাছ, বাদাম এবং বীজ তেল। এইসব উপাদান ব্যবহার করে রাতের বেলায় আপনার দেহ পুনরুজ্জীবন এবং মেরামতের কাজ সারতে পারবে।
প্রধান তিন বেলা খাবারের মাঝে অন্তত এক বা দুই বেলা হালকা খাবার খেতে পারেন।

সঠিক সময়ে খাবার খান
সুস্থ্য থাকার জন্য কখন খাবার খাচ্ছেন তা খেয়াল রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। সকালে ঘুম থেকে ওঠার অন্তত আধা ঘন্টা পর নাশতা খান। নাশতার অন্তত তিন ঘন্টা পর দুপুরের খাবার খান। তেমনিভাবে দুপুরের খাবারের অন্তত তিন ঘন্টা পরে বিকালের হালকা খাবার ও চা খান। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দুই ঘন্টা আগে রাতের খাবার খাওয়া উচিত। যাতে বিছানায় যাওয়ার আগেই হজমের কাজ শেষ করতে পারে আপনার দেহ।

সূত্র: এনডিটিভি

পড়া হয়েছে ১৬৫ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ