মানবদেহের যে অঙ্গগুলো গবেষণাগারে জন্মানো যায়!

আগস্ট ২৯, ২০১৭, ৫:০১ অপরাহ্ণ

আত্মরক্ষার জন্য একটি টিকটিকি প্রথমেই যা করে তা হলো নিজের লেজটি খসিয়ে ফেলে দেওয়া। এটা তার আত্ম-প্রতিরক্ষামুলক কৌশলগুলোর একটি। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই টিকটিকিটির আরেকটি নতুন লেজ গজায়। আমরা মানুষেরাও কি এই স্বপ্ন দেখিনা যে দুর্ঘটনায় হারানো আমাদের অঙ্গগুলোও যদি পুনরায় গজানো যেত? কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন মানুষের বেলায়ও এমনটা করা সম্ভব?

প্রতিদিন আমাদের দেহের যে কোষগুলো মরে যাচ্ছে প্রতিনিয়তই সেখানে নতুন নতুন কোষ জন্মাচ্ছে। তবে কোষের এই পুনর্জন্ম বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাম যাচ্ছে। তবে মৃতুর আগ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।

মানবদেহেরও বেশ কয়েকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গবেষণাগারে জন্মানো সম্ভব হয়েছে। বিষয়টি কোনো রসিকতা নয় বরং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। আসুন জেনে নেওয়া যাক …

১. গর্ভনালী
জার্মানির বার্লিনের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইনফেকশন বায়োলজি-র বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল থেকে গর্ভনালী জন্মাতে সক্ষম হয়েছেন। ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু যে দুটি নালী বেয়ে জরায়ুতে যায় তাদেরকে বলে গর্ভনালী। বিজ্ঞানীরা আসলে গর্ভনালীর সবচেয়ে ভেতরের সেলুলার স্তরটি জন্মাতে সক্ষম হয়েছেন।

২. ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক
ত্বকের কোষ থেকে পেন্সিল ইরেজার এর সমান একটি মস্তিষ্ক জন্মানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় (ওএসইউ) বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ল্যাবে উৎপাদিত ওই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কটি ৫ সপ্তাহ বয়সী মানব ভ্রুণের মস্তিষ্কের সমান।

৩. ক্ষুদ্র হৃদপিণ্ড
গবেষকরা প্রথমে স্টেম সেল থেকে হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন ধরনের মাংসপেশি এবং সংযোজক টিস্যু উৎপাদন করেছেন। সেসবকেই পরে একত্রিত করে একটি ক্ষুদ্র হৃদপিণ্ড জন্মানো হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে এর জৈবপ্রকৌশল অধ্যাপক এবং ওই গবেষণার সহ-সিনিয়র গবেষক বলেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা গর্ভাবস্থায় কোন ওষুধ ব্যবহার করলে শিশু জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে তা বলা যাবে। এর মাধ্যমে গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক ওষুধগুলো সনাক্ত করা যাবে।

৪. ক্ষুদ্র কিডনি
অস্ট্রেলিয় বিজ্ঞানীদের একটি দল গবেষণাগারে একটি ক্ষুদ্র কিডনি জন্মিয়েছেন। স্টেম সেল ব্যবহার করে তিন ধরনের কিডনি কোষ জন্মানো সহ অঙ্গ জন্মিয়েছেন তারা। স্বাভাবিকভাবে মানবদেহে যেভাবে কিডনি জন্মায় ঠিক একই প্রক্রিয়ায় গবেষকরা ওই কিডনিটি জন্মিয়েছেন।

৫. ক্ষুদ্র ফুসফুস
বিশ্বের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা মিলে এই ক্ষুদ্র থ্রিডি ফুসফুস জন্মানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিজ্ঞানীরা শ্বাসনালীদ্বয় এবং ফুসফুসের থলি জন্মাতে সক্ষম হন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুল এর ইন্টার্নাল মেডিসিন অ্যান্ড সেল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজির সহকারি অধ্যাপক জ্যাসন আর. স্পেন্সার বলেন, ‘এই ক্ষুদ্র ফুসফুসটি বাস্তবের টিস্যুর প্রতিক্রিয়া নকল করতে পারবে। এর মাধ্যমে কীভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কীভাবে গঠিত হয় এবং রোগের কারণে কীভাবে সেসবের পরিব্রতন ঘটে তা বুঝা যাবে। এ্রছাড়া নতুন ওষুধের প্রতি কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তাও জানা যাবে। এই ক্ষুদ্র ফুসফুস গবেষণাগারে ১০০ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিল।

৬. ক্ষুদ্র পাকস্থলী
অসম্ভব মনে হলেও এটাও সম্ভব! গবেষকরা উদঘাটন করেছেন, একটি পেট্রি ডিশে মাত্র এক মাসের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র পাকস্থলী জন্মানো সম্ভব। ওই ডিম্বাকৃতি, ভেতরে ফাঁপা জিনসটি পাকস্থলির দুটি অংশের একটির মতো।

৭. নারী জননাঙ্গ
সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় জার্নালে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যাতে নারী জননাঙ্গ থেকে কোষ নিয়ে গবেষণাগারে নারী জননাঙ্গ আকৃতির একটি স্ক্যাফোল্ডে নারীর জননাঙ্গ উৎপাদন করা হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে এই পদ্ধতিতে নারী জননাঙ্গ উৎপাদন করে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী বেশ কয়েকজন মেয়ের চিকিৎসা করা হয়। যাদের জননাঙ্গ সঠিকভাবে বেড়ে ওঠেনি। এদের অনেকের জননাঙ্গ এবং জরায়ু বা গর্ভাশয়ই ছিল না। বা ঠিক মতো বেড়ে ওঠেনি। ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত জননাঙ্গ তাদের দেহে প্রতিস্থাপনের পর আট বছর ধরে তাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় যে তাদের সবকিছু স্বাভাবিক আছে কিনা।

৮. পুরুষ জননাঙ্গ
ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটির রিজেনারেটিভ মেডিসিন এর বিজ্ঞানীরা খরগোশের জননাঙ্গ থেকে কোষ নিয়ে পুরুষ জননাঙ্গের পেনাইল ইরেকটাইল টিস্যু উৎপাদন করেন। পরে সেই টিস্যু পুরুষ খরগোশের জননাঙ্গে প্রতিস্থাপন করা হয়। এই গবেষণা প্রক্রিয়া এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। আর এই ধরনের গবেষণা মানুষের বেলায় করতে গেলে অনুমোদন নিতে হবে। যা এখনো নানা নৈতিক বিধিনিষেধের কারণে সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি।

৯. খাদ্যনালী
রাশিয়ার ক্রেসনোডার-এ কিউবান স্টেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল স্টেম সেল থেকে একটি কার্যকর খাদ্যনালী উৎপাদন করেছেন। অঙ্গটি ১০টি ইদুরের দেহে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। এবং মূল অঙ্গের ২০% পর্যন্ত প্রতিস্থাপন করা গেছে।

১০. কান
মানুব শিশুর কানের থ্রিডি মডেল বানিয়ে তাতে গরুর জীবন্ত কোষ এবং কোলাজেন পুশ করে কান জন্মিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এরপর সেই কান ইদুরের দেহে প্রতিস্থাপন করে তিন মাস পর্যন্ত ওই কানের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করনা হয়।

১১. লিভার কোষ
প্রথমবারের মতো জার্মানি ও ইসরায়েলের গবেষকরা লিভারের কোষ হেপাটোসাইটস জন্মিয়েছেন গবেষণাগারে। ২৬ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে জার্নাল ন্যাচার বায়োটেকনোলজিতে তাদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। তবে এটি নিয়ে আরো গবেষণা করতে হবে।

১২. ব্লাডার বা মূত্রাশয়
উত্তর ক্যারোলিনার ওয়েক ফরেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মূত্রাশয়ের কোষ থেকে মূত্রাশয় উৎপাদন করে সফলভাবে রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করেছেন। সাত সপ্তাহ ধরে গবেষণাগারে জন্মানোর পর ২০০৬ সালে সাতজন রোগীর দেহে এই প্রতিস্থাপন করা হয়। ২০১০ সালেও এই নিয়ে গবেষণা হয়।

১৩. স্তন কোষ
জার্মানির হেলমহোল্টজ সেন্টার ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এর বিজ্ঞানীরা স্তনের কোষ থেকে স্তন গ্রন্থি উৎপাদন করেছেন। যা থেকে তারা স্তনের গঠন কাঠামো নিয়ে গবেষণা করবেন।

এছাড়া মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড এবং চোখের রেটিনার কোষ নিয়ে গবেষণা চলছে জাপানের কোবেতে অবস্থিত রিকেন সেন্টার ফল ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজি (RIKEN Center for Developmental Biology)-তে।

সূত্র: বোল্ড স্কাই

পড়া হয়েছে ১২৮ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ