অপরূপ টাঙ্গুয়া হাওরে

আগস্ট ৩১, ২০১৭, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ

ফরহাদ হোসেন

দেখতে দেখতেই চলে এল আরেকটি ঈদ। এল খুশির দিন, আনন্দের দিন। ঈদের আনন্দ সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমরা অনেকেই কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি পেলেই ছুটে যাই মাটির কাছে, মায়ের টানে। স্বজনদের টানে। আমরা যারা মাটির সংস্পর্শে বড় হয়েছি, বেড়ে উঠেছি কিংবা প্রিয় গ্রামই যাদের স্থায়ী ঠিকানা, তারা তো ছুটি পেলেই দেই ভোঁ-দৌড়। তাই ঈদের ছুটিতে ভালবাসার গ্রামে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের কমবেশি সবারই আছে। সেই সাথে যদি কারো কারো যোগ হয় হাওরে ভ্রমনের আনন্দ তবে মন্দ কি!

এই ঈদে যদি হাতে একটু বেশি সময় থাকে তবে পরিবার পরিজন বা বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় টাঙ্গুয়া হাওরে। যার অবস্থান সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলায়। এর উত্তরে রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মেঘ-বৃষ্টিস্নাত সুউচ্চ পাহাড়ের রাশিমালা, আর তিন দিকে সবুজ শ্যামল জলধারার গ্রাম্য প্রকৃতি। যেখানে এসে পাহাড় শেষ হয়েছে ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়েছে হাওরের জলধারা। বহুদূর থেকে দেখা যায় মেঘালয়ের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধবধবে সাদা মেঘ নিজেকে আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে।

আবার কখনও সাদা দুধের নহর যেন। ছুটে চলা নৌকা যত দূরেই যাক, পাহাড় আপনার সঙ্গ ছাড়বে না। যতই কাছে যেতে থাকবেন ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকবে সবকিছু।

 

নৌকায় উঠেই আপনার প্রাণটা জুড়িয়ে যাবে হাওরের নির্মল কোমল বিশুদ্ধ বাতাসে। নৌকা যতই এগোতে থাকবে, গ্রামগুলো ততই অষ্পষ্ট হতে থাকবে। এক সময় বহু দূরের মনে হবে তাদের। নৌকার গুলইয়ে আছড়ে পড়া ঢেউ যেমন মনকে পুলকিত করবে, তেমনি অনেকটা ভয়েরও সঞ্চার করবে। এভাবেই চলতে চলতে জীবনের নাও ভাসানোর কত কথা মনের কোনে দানা বাঁধতে থাকবে! মনে হবে, হায়রে জীবন! কোথায় কোন কালে কি আমি আসিয়াছিলাম এই মায়াভরা হাওরে!

 

এখানে জীবন কত সরল। এখানে প্রতিক্ষণে জীবনের রং প্রকৃতির মত সবুজ। হাওরের জলে ভাসতে ভাসতে চলে যাবেন এক সময় হাওরের ওয়াচ টাওয়ারে। সেখানে পাবেন প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়ুয়া ছোট ছোট স্কুল ছাত্রদের। তারা আপনাদের স্বাগতম জানাবে তাদের ডিঙ্গি নৌকায় করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। বিনিময়ে দুটো টাকা যা দিয়ে তারা কিনে নিবে তাদের প্রয়োজনীয় বই-খাতা। ওয়াচ টাওয়ারের পাশে রয়েছে প্রায় ডুবো ডুবো হিজলের বাগান। গাছগুলো আপনার প্রাণটা ভরিয়ে দিবে। ওয়াচ টাওয়ার শেষে আবারও ছুটে চলা। এমনভাবে চলতে চলতে দেখতে পারবেন হাওরের জীবন, বাস্তবতা, তাদের ছুটে চলা, তাদের পানিময় জীবনের হাজারো প্রতিচ্ছবি। অনেকটা সময় চোখে পড়বে পানিতে ঠিক ভাসমান একটি বাড়ি বা শুধুই কিছু বৃক্ষ। আবার কখনো দেখতে পাওয়া যাবে স্থানীয় বাজার। যাদের সবাই চলছে নৌকা নিয়ে। এমন সব দেখতে দেখতে চলে যেতে পারেন টেকেরঘাট। যেখানেই আছে নিলাদ্রী লেক আর মেঘালয়ের পাহাড়ের সারি।

 

হাওরে ঘুরে বেড়ানোর একমাত্র বাহন ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নৌকা ভাড়া করা যাবে এক দিন থেকে কয়েক দিনের জন্য। সদস্য বেশি হলে বড় নৌকাও পাওয়া যাবে। তাতেই কাটবে দিন রাত। খাওয়া থেকে শুরু করে সব। সকালে গিয়ে বিকালে ফিরে আসতে চাইলেও পাওয়া যাবে সেই অনুসারে নৌকা। সদস্য কম হলেও পাওয়া যাবে ছোট নৌকা। সময় অনুসারে ভাড়া ঠিকঠাক করে নেওয়া যাবে।

ঢাকা বা অন্য যেখানেই থাকুন না কেন চলে যান সুনামগঞ্জ। সেখান থেকে দুটি রাস্তায় যেতে পারেন টাঙ্গুয়া হাওরে। একটি হলো মোটরবাইক নিয়ে সুমানগঞ্জ থেকে বিশ্বম্ভরপুর, লাওরেরগড়, যাদুকাটা নদী ও বারিকের টিলা হয়ে টেকেরঘাটের নিলাদ্রী লেক পর্যন্ত। অন্য রোড হলো সুনামগঞ্জ থেকে সিএনজি বা প্রাইভেট যোগে গ্রামিণ আঁকাবাঁকা পথ ধরে তাহিরপুর উপজেলা শহরে। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় টাঙ্গুয়ার হাওর। দলের সঙ্গে ছেলে-মেয়ে উভয়ই থাকলে এই পথটাই সবচেয়ে ভাল।

এদিক সেদিক যেদিকেই ঘোরেন না কেন, সাগরের মত হাওড় যেমন শেষ হবে না তেমনি পাহাড়ও শেষ হবে না। মন চাইবে দুটোকেই পকেটে পুরে নিয়ে আসি আমাদের এ যন্ত্রনার শহরে। যেখানে গেলে শুধু আপনার মনটাই ভরবে না, শ্বাস প্রশ্বাসে মিলবে বিশুদ্ধ বাতাস। মনটাকে সত্যিকার অর্থে বড় করতে, শহুরে ইট-কাঠ-পাথরের জীবনকে কয় দিনের জন্য দূরে রাখতে, সবুজ-শ্যামল আর স্বচ্ছ পানির বহমান ধারায় নিজেকে প্রবাহিত করতে এ হাওরের জুড়ি মেলা ভার। তো চলুন না বেরিয়ে পড়ি!

পড়া হয়েছে ১৪০ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ