শিশুর ডায়রিয়া হলে বেশি বেশি খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ান

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭, ৩:৩২ অপরাহ্ণ

 

ছবি : তারেক আজিজ নিশক

ডায়রিয়া বা পানিস্বল্পতার কারণে শিশুর অপুষ্টি, রাতকানাসহ অন্যান্য রোগ দেখা দিতে পারে। সময়মতো সুচিকিৎসা না হলে অনিবার্য মৃত্যুও হতে পারে। লিখেছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী

 

ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়াই ডায়রিয়া, যা সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় তিনবার বা তারও বেশিবার হয়। অর্থাৎ মলে যদি পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, তবেই তাকে ডায়রিয়া বলে ধরে নেওয়া হয়। আবার পায়খানা বারবার হয়েও মল যদি পাতলা না হয়, তবে তা ডায়রিয়া নয়।   মনে রাখতে হবে, শুধু মায়ের দুধ পান করে এমন শিশু অনেক সময় দিনে পাঁচ-দশবার পর্যন্ত পায়খানা করতে পারে, যা পেস্টের মতো সামান্য তরল হয়, একে কখনো ডায়রিয়া বলা যাবে না। শিশু যদি খেলাধুলা করে, হাসিখুশি থাকে, তাহলে এর অন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।

 

ধরন

তীব্র ডায়রিয়া : এটা হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন স্থায়ী হয়। তবে কখনো ১৪ দিনের বেশি নয়।

দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া : শুরু হওয়ার পর ১৪ দিন বা তারও বেশি সময়, কখনো কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে।

জলীয় ডায়রিয়া : মল খুবই পাতলা হয়, ক্ষেত্র বিশেষে একেবারে পানির মতো।

মলে কোনো রক্ত থাকে না।আমাশয় বা ডিসেন্ট্রি : মলে রক্ত থাকে, যা চোখে দেখা যায়।

 

কারণ

কতকগুলো রোগজীবাণু খাদ্যনালিতে প্রবেশ করে ডায়রিয়া ঘটায়। এগুলো রোটাভাইরাস, ই-কোলাই, সিগেলা, ভিবরিও কলেরা, প্যারাসাইট-এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা ও জিয়ারডিয়া প্রভৃতি নামে পরিচিত। সাধারণত খাদ্য বা পানীয়ের দ্বারা ডায়রিয়া জীবাণু খাদ্যনালিতে প্রবেশ করে। এর অন্যতম মাধ্যম অপরিষ্কার হাত, গ্লাস, চামচ, বাসনপত্র বা সচরাচর ব্যবহূত অন্যান্য জিনিসপত্র, মল, মাছি ইত্যাদি।

 

পানিস্বল্পতা নির্ণয়

ডায়রিয়াকালীন শিশুর শরীর থেকে পানি ও জলীয় অন্যান্য পদার্থ বেরিয়ে যাওয়ার কারণে দেহে পানিস্বল্পতা দেখা দেয়। ডায়রিয়ার তীব্রতা এই পানিস্বল্পতার পরিমাণ বিভিন্ন স্তরের হতে পারে। যেমন :

পানিস্বল্পতা নেই : শিশুর চোখ যদি স্বাভাবিক ও পানিসমৃদ্ধ থাকে, মুখ ও জিহ্বা ভেজা থাকে, তৃষ্ণার্ত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে পানি পান করে, পেটের চামড়া ধরে ছেড়ে দিলে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়, তবে বুঝতে হবে শিশুর পানিস্বল্পতা নেই।

এ অবস্থায় প্রয়োজনমতো পানি, খাবার স্যালাইন বা লবণ-গুড়ের শরবত দেওয়া যেতে পারে।

কিছু পানিস্বল্পতা : শিশুর অবস্থা যদি অস্থির, খিটখিটে হয়, তার চোখ যদি বসে যায়, চোখে যদি পানি না থাকে, মুখ ও জিহ্বা যদি শুকনো থাকে, যদি বেশি তৃষ্ণার্ত থাকে, পেটের চামড়া ধরে ছেড়ে দিলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়—শিশুর শরীরে এসবের দুই বা ততোধিক চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে ‘কিছু পানিস্বল্পতা’র স্তরে রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বেশি বেশি খাবার স্যালাইন, বুকের দুধ, ভাতের মাড়, পানি, ডাবের পানি কিংবা শুধু পানি খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর রোগীকে পরীক্ষা করে পানি ঘাটতির স্তর নির্ণয় করে দেখতে হবে যে রোগী কোন স্তরে আছে। সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

চরম পানিস্বল্পতা : যদি অবসন্ন, নেতিয়ে পড়া, অজ্ঞান কিংবা ঘুমঘুম ভাব থাকে, চোখ বেশি বসে যায় এবং শুকনো দেখায়, চোখে পানি না থাকে, মুখ ও জিহ্বা খুব শুকনো থাকে, পানি পান করতেও কষ্ট হয় কিংবা একেবারেই পারে না, পেটের চামড়া ধরে ছেড়ে দিলে অত্যন্ত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়—শিশুর দেহে এসবের মধ্যে দুই বা ততোধিক চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে শিশুটি ‘চরম পানিস্বল্পতা’ স্তরে রয়েছে।

চরম পানিস্বল্পতা অবস্থার জরুরি চিকিৎসায় তত্ক্ষণাৎ শিরায় স্যালাইন দিতে পারলে ভালো। এ জন্য শিশুকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করে বা চিকিৎসক ডেকে বাড়িতে চিকিৎসা দিতে হবে।

 

ঘরে স্যালাইন তৈরির নিয়ম

প্রথমে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। আধা লিটার বা আধা সেরের চেয়ে বেশি পানি ধরে এমন একটি পাত্র এবং আধা লিটার বা আধা সের মাপা যায় এমন একটি গ্লাস বা অন্য কোনো পাত্র পানি দিয়ে ভালোমতো পরিষ্কার করে নিন। স্যালাইন বানানোর পাত্রে আধা লিটার বা আধা সের খাবার পানি মেপে নিন এবং তাতে তিন আঙুলের প্রথম ভাঁজের একচিমটি লবণ দিন। এরপর এক মুঠো গুড় বা চিনি পানির মধ্যে দিন এবং ভালো করে মেশান, যেন কোনো তলানি পাত্রের নিচে জমা না থাকে। এবার মিশ্রণ চেখে দেখুন, যদি চোখের পানির চেয়ে তা বেশি লবণাক্ত হয়, তবে ওই মিশ্রণ ফেলে দিয়ে আবার কম লবণাক্ত শরবত তৈরি করুন।

 

স্যালাইন সংরক্ষণ সময়

প্যাকেট থেকে তৈরি করা খাবার স্যালাইন ১২ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়। ১২ ঘণ্টা পর অবশিষ্ট থাকলেও তা ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন তৈরি করে খাওয়াতে হবে। আবার ঘরে তৈরি করা লবণ-গুড় অথবা চিনির শরবত ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। এরপর তা অবশিষ্ট থাকলেও ফেলে দিয়ে নতুন করে স্যালাইন বা শরবত তৈরি করে খাওয়াতে হবে।

 

ডায়রিয়া এড়াতে হলে

ডায়রিয়া প্রতিরোধে অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় মেনে চললে ডায়রিয়ার প্রকোপ অনেক কমে যায়। সেগুলো হলো :

♦   পরিবারের সবাইকে ভালোমতো হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। বিশেষত খাওয়ার আগে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে, পায়খানা করার পর, শিশুর পায়খানা পরিষ্কার করার পর, রান্না করার আগে, খাবার পরিবেশন করার আগে অবশ্যই সাবান ও যথেষ্ট পরিমাণ পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।

♦   শিশুর ও নিজের নিয়মিত নখ কাটা, প্রতিদিন গোসল, বাচ্চাকে দুধ দেওয়ার আগে স্তন পরিষ্কার ইত্যাদি করা।

♦   জন্মের প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো। কেননা বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুর ডায়রিয়া হয় না, কারণ বুকের দুধ জীবাণুমুক্ত শিশুরোগ প্রতিরোধকারী। বোতলে দুধ খাওয়ালে ডায়রিয়া বেশি হয়। কারণ বোতল সব সময় পরিষ্কার রাখা কখনোই সম্ভব নয়। তবে ছয় মাস বয়স হওয়ার পর থেকে শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার পরিবারের সবাই যা খায় তা নরম করে পরিবেশন করে খাওয়াতে হবে।

♦   সাধারণত টিউবওয়েলের পানি বা ফোটানো পানি নিরাপদ। টিউবওয়েলের কাছে গোসল, ধোয়ামোছা বা মলমূত্র ত্যাগ করতে দেওয়া যাবে না। পায়খানা অবশ্যই টিউবওয়েলের ১০ মিটার দূরে ও নিচুতে হতে হবে ও পশুর নাগালের বাইরে রাখা উচিত। পরিষ্কার পাত্রে পানি সংগ্রহ করা উচিত। মূল পাত্র থেকে পানি তোলার জন্য ব্যবহূত মগ আলাদা থাকা দরকার।

♦   শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলেই হামের টিকা দিতে হবে। কেননা হাম আক্রান্ত শিশু সহজেই ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়।

♦   স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরি করতে হবে এবং বাড়ির ছোট-বড় সবাইকে সেখানে মলত্যাগ করতে হবে। পায়খানায় যেন মাছি না ঢুকতে পারে এবং মল যেন ডোবা, পুকুর, নদী বা ব্যবহার করার পানির সঙ্গে না মেশে, এরূপভাবে পায়খানা তৈরি করতে হবে।

♦   ছোট শিশুদের পায়খানা বড়দের মতোই রোগ ছড়াতে পারে, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি। তাই শিশু পায়খানা করার পরপরই তা তুলে নিয়ে বড়দের ল্যাট্রিনে ফেলতে হবে। পায়খানা করার পর শিশুদের পরিষ্কার করে সেই পানিও ফেলে দিতে হবে।

পড়া হয়েছে ৪৪ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ