বিশ্ব কূটনীতিতে অকস্মাৎ বাঁক রোহিঙ্গা রক্ষায় শক্তিধরদের যোগ

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭, ৪:৩৫ অপরাহ্ণ
মেজর জেনারেল মো. আব্দুর রশীদ (অব.)

বর্মি সেনাদের অবর্ণনীয় পৈশাচিক দমন ও পীড়ন থেকে বাঁচতে সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা জনস্রোত বাংলাদেশে ঢুকেই চলেছে। জাতিসংঘের গণনায় ইতিমধ্যে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে।

তাদের আশঙ্কা এ সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছতে পারে। রোহিঙ্গা বিতাড়নের বর্মি কৌশলকে উল্টে দিতে এবং উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ শরণার্থীদের জায়গা দিতে দ্বিধা করলেও মানবতার মহাবিপর্যয় দেখে সীমান্ত খুলে দিয়েছে। নির্যাতিত ও বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সময়োচিত সাহসী ও মানবিক ভূমিকা বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। বর্মি সেনাদের হত্যা, ধর্ষণ, গ্রাম পুড়িয়ে রোহিঙ্গা জাতিকে নিধনের সুকৌশলী প্রক্রিয়া বিশ্বের কাছে উন্মোচিত হলে বিশ্ববিবেক হতবাক হয়ে নিন্দায় সোচ্চার হয়। প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শন নির্যাতিত ও আতঙ্কিত আরাকানি রোহিঙ্গাদের জীবনের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়া মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। স্বজন হারানোর ব্যথা দূর না করতে পারলেও জীবনের অনিশ্চয়তার অবসান করে চোখের পানি ঝরিয়েছেন আবার মুছেও দিয়েছেন।সম্পদের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানবতার বিশাল বোঝা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাদরে মাথায় তুলে নিলে বিশ্ব চমকে ওঠে। বিশ্বমানবতার জেগে ওঠা থেকে আকস্মিকভাবে বাঁক নিতে দেখা যায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে। মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকা দেশগুলো সরে আসে সন্তর্পণে। আশ্রয় নেওয়া মানুষের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। বিপন্ন মানবতার পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানোর জন্য বিবিসির সংবাদদাতা শেখ হাসিনাকে ‘মানবতার জননী’ বা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বলে আখ্যায়িত করলে বাংলাদেশের মানুষ দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও আবেগে আপ্লুত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের ভূমিকা মানবতার সুরক্ষা দিতে বিশ্বকে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

গত ২৫ আগস্ট উত্তর রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর চৌকিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি সংগঠন হামলা চালালে ১২ জন নিরাপত্তা সদস্য এবং ৭০ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়। সন্ত্রাস দমনের নামে বর্মি সেনারা রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় নির্মমভাবে দমন-পীড়ন শুরু করে। নিরীহ মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, গ্রাম জ্বালিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়ন করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদে রাখাইনদের উজ্জীবিত করে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সম্প্রীতির মনস্তত্ত্বকে হত্যা করে সহিংসতা ও বিদ্বেষকে কৌশল বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে বেছে নেয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, গ্রাম জ্বালিয়ে সেখানে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে। এমনকি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশপথে স্থলমাইন পুঁতে নিরীহ মানুষকে ঘায়েল করার অমানবিক পন্থা অনুসরণ করে। জেনেভাভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বর্মি সেনাদের মাইন পোঁতা ও পরিকল্পিতভাবে গ্রাম পোড়ানোর সত্যতা পেয়েছে।

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী গণতন্ত্রের নেতা হিসেবে পরিচিত অং সান সু চির সরকার রোহিঙ্গা জাতিসত্তাকে অস্বীকার করার সামরিক ফন্দির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে তার নৈতিক সত্তাকে বিকিয়ে দিয়ে সারা বিশ্বের কাছে ঘৃণা কুড়িয়েছেন। নোবেল পদকের যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেছেন ইতিমধ্যে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এক সময়ের লড়াকু সৈনিক এবং সেনা শাসনের সময় ১৫ বছর গৃহবন্দী থেকেও সেনাদের রোহিঙ্গা জাতি নিধনের পৈশাচিকতায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে রোহিঙ্গা জাতিসত্তাকে অস্বীকার করে জন্ম দিলেন মানবতার সংকট। বিশ্বের ১২ জন নোবেল বিজয়ীর যুক্তবার্তা অং সান সু চির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ঢাকতে এবং রোহিঙ্গা বিতাড়নের পরিকল্পিত সামরিক প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে রোহিঙ্গাদের বাঙালি সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে কট্টর ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটানো শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে মানায় না। রাখাইন রাজ্যে ১৭৬টি রোহিঙ্গা গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও জাতি নিধনের মতো মারাত্মক মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং মহাসচিব মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।

রাখাইন রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কাছে মিয়ানমারকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একে অপরের প্রাধান্য কমানোর প্রতিযোগিতায় থাকা চীন ও ভারত মিয়ানমারকে নিজ বলয়ে আটকে রাখতে সে দেশের অন্যায় আবদার ও কর্মকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির ক্ষেত্র হিসেবে মিয়ানমারে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের বিনিয়োগের আগ্রহ থেকে জন্ম নেওয়া স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা নিধনে উৎসাহিত করেছে। নিরীহ মানুষের মানবিক অধিকারের বিষয়টি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গুরুত্ব পেলেও আঞ্চলিক দেশ ভারত ও চীনের কাছে প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার পায়নি।

গত বছরের অক্টোবরে তিনটি নিরাপত্তা ফাঁড়িতে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সেনা অভিযান শুরু হয় রাখাইনে। অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতাকে সন্ত্রাস দমনের মূল ভিত্তি করে খুন, গুম, আটক, ধর্ষণ, গৃহ থেকে উচ্ছেদ ও অগ্নিসংযোগ করে গণহারে দমন-নিপীড়ন করে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা ছিল আসল উদ্দেশ্য। সীমানা খোলা না থাকলেও ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। গত মার্চে নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আটকে দিলে মিয়ানমার আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নিধনে নতুন নতুন ফন্দি ফিকির খুঁজতে থাকে।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে তারা বিচ্ছিন্ন হওয়ার রাজনীতি করেনি। বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারে দুই নারীসহ ১৭ জন রোহিঙ্গা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীও হয়েছিলেন। সরকারের সচিবসহ শীর্ষ পদেও আসীন ছিল রোহিঙ্গারা। ১৯৯০ সালের নির্বাচনেও পার্লামেন্টে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের চারজন প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে কেড়ে নেওয়া হয় ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাস্তবায়নের নামে। নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের ভোটাধিকার হরণ করে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। পাশবিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এখন রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন করে জাতি নিধনের পথে হাঁটছে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার। মিয়ানমার বিশ্বের কাছে রোহিঙ্গা নিধনকে সন্ত্রাস দমনের গল্পে রূপান্তরিত করে বিশ্বকে বোঝাতে চেষ্টা করলে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ তা মেনে না নিলেও ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মিয়ানমারের শঙ্কা দূর করতে বাংলাদেশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান সুস্পষ্ট করে এবং কোনো সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মিয়ানমারের অসত্য বর্ণনাকে অচল করে দেয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আগেও চীনের অবস্থান মিয়ানমারের পক্ষে শক্ত ও সরব ছিল। পশ্চিমা দেশগুলো রাখাইনে সন্ত্রাসী হামলা এবং সমানভাবে সহিংস সেনা অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অনতিবিলম্বে তা বন্ধ করে স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরির দাবি জানায় শুরু থেকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানের মুসলিম সদস্য মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়। যোগ দেয় তুরস্ক, তিরস্কার ছোড়ে ইরান। ইরাক, সৌদি আরব ও তার মিত্রদের নিশ্চুপ থাকতে দেখা যায়। ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো বন্ধু দেশগুলো রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের দিকে হাত প্রসারিত না করলে বাংলাদেশের কূটনীতি ভর করে জাতিসংঘের ওপর, সঙ্গে পেয়ে যায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যকে। রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে ক্রমেই নতুন নতুন দেশ এগিয়ে আসতে থাকে।

গত বুধবার নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নয় বছর পর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রথম বিবৃতি আদায় সম্ভব হয়েছে। সেনা অভিযানে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে উদ্বেগ প্রকাশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, আইনশৃঙ্খলা ফেরত আনা ও বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা ও শরণার্থী সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। খোলা অধিবেশনে আলোচনার দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বিবৃতির সঙ্গে যোগ করতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। জাতিসংঘের মহাসচিব মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নির্যাতনকে জাতিগত নিধন বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। উত্তর কোরিয়া ও ইউক্রেনের উত্তেজনার মধ্যেও রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার শীর্ষেই রয়ে গেছে।

পরের দিন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্টে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এবং মিয়ানমারকে নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এমনকি অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের হুমকি আসে। রেজ্যুলেশনে বলা হয়, ইইউ সদস্যরা ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের জন্য প্রস্তুত এবং মিয়ানমার যেসব বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে থাকে সেটি পুনর্বিবেচনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি রাখাইনে হত্যা, সহিংস ঘটনা, বেসামরিক নাগরিকের সম্পদ ধ্বংস এবং বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণ বন্ধের জন্য মিয়ানমার সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি জোরালো আহ্বান জানায়। মিয়ানমার সরকার ও বিশেষ করে স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিকে আহ্বান জানানো হয় সব ধরনের জাতিগত ও ধর্মীয় সহিংসতাকে নিন্দার জন্য। বাংলাদেশ সীমান্তে পেতে রাখা ল্যান্ডমাইন সরিয়ে ফেলতে বলে তারা। আনান কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে রেজ্যুলেশনে দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়, ২০১৫ সালের ১৮ মে অং সান সু চির রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র বলেছিলেন, মিয়ানমার সরকারের উচিত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া।

আহ্বান জানানো হয় সহিংসতা বন্ধে ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে চীন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিকে ভূমিকা রাখতে। আসিয়ান ও আঞ্চলিক সরকারসমূহ যেন মিয়ানমার সরকারের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং সব বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা ও শরণার্থীদের সহায়তা দেয় এবং রাখাইনে ত্রাণ পাঠায়। এরপর কূটনৈতিক অঙ্গনে ইউটার্ন শুরু হয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার গতি বৃদ্ধি পায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরকালে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে কোনো কথা না বলে মিয়ানমারকে সন্ত্রাস নিধন অভিযানে পাশে থাকার অঙ্গীকার বাংলাদেশকে হতাশ করে। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা করে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি অবহিত করলে ভারত অবস্থান পরিবর্তন করে বিবৃতি দেয়। কিন্তু পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করে রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকার নতুন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে দ্বিপক্ষীয় ও বহুমুখী চাপ প্রয়োগেও ব্রতী হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে থাকা ৪৮ দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে গেলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের কথা শুনে হতবাক হয়ে মানবতার বিপর্যয় ঠেকাতে তারা বেশি প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। মিয়ানমারের পক্ষে পোক্ত অবস্থানে থাকা চীন নমনীয় হয়ে ত্রাণ পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথা জানায়। চীন অনড় অবস্থান থেকে সরে আসায় নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা ও বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। যদিও চীনের সম্মতির অভাবে নিরাপত্তা পরিষদ শক্ত অবস্থানে যেতে পারেনি।

রোহিঙ্গার পক্ষে বিশ্ব জনমত জোরদার থাকায় কূটনীতিতে অকস্মাৎ বাঁক দেখা যায়। ভারত ও চীন বিনিয়োগ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে মানবতার মূল্যবোধকে অবমূল্যায়িত করায় বিদেশ নীতি টেকসই হতে পারেনি। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিরীহ মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সরকারে ক্ষমতার ভারসাম্যের অভাবকে বিবেচনায় নিয়ে অং সান সু চিকে নৈতিক শক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। বর্তমান ভূ-রাজনীতির গোলকধাঁধায় রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ, ভারত মিয়ানমার ও চীনের সমর্থন ব্যতিরেকে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো দুষ্কর।

রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর এক মেরুতে অবস্থান বাংলাদেশের কূটনীতিকে সার্থকতার দিকে নিয়ে গেছে এবং রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও অধিকারসহ ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। জাতিসংঘের আগামী ৭২তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রী অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট উত্থাপন করবেন। ইতিমধ্যে বিশ্বের ছোট বড় দেশের অকুণ্ঠ সমর্থনের আভাস বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি প্রদানে মিয়ানমারকে বাধ্য করার মধ্যে এখন আন্তর্জাতিক সক্ষমতা প্রদর্শন মানবতা রক্ষার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমার সেনাদের দ্বারা সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে বিচারের আওতায় এনে ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকাতে পারলেই অত্যাচারিত ও নির্যাতিত রোহিঙ্গারা স্বস্তি এবং প্রাণ বিসর্জন দেওয়া নিরীহ মানুষের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সোভাগ্য তৈরির জন্য।

লেখক : নিরাপত্তা ও স্ট্র্যাটেজি বিশ্লেষক। ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস (আই ক্লাডস)-এর নির্বাহী পরিচালক।

 

পড়া হয়েছে ১৬৬ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ