ঘুরে আসুন সোনারগাঁয়ের বারদী

সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
পুকুড় পাড়ে শেওলা ধরা, ইট খসে পড়া শানবাঁধানো ঘাট। হিন্দু নাগ জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যের ধ্বংসাবশেষ। ইমারতের গায়ে বিভিন্ন স্থাপত্যকর্ম, পুরনো আমলের দীঘি, নদীর বুকে জেগে ওঠা চর অথবা গ্রামবাংলার প্রকৃত রূপধারী জনপদ দেখতে কার না ইচ্ছে হয়। ওই রূপ দেখে বিমোহিত হওয়ার সুযোগ নিতে অবসর সময়ের যে কোনো অলস দুপুর কিংবা স্নিগ্ধ বিকেলে ঘুরে আসতে পারেন রাজধানী ঢাকার খুব কাছেই সোনারগাঁয়ের বারদী থেকে।
বাংলার প্রাচীন রাজধানী ও এক সময়ের সমৃদ্ধশালী জনপদ সোনারগাঁ। সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁর রাজধানী আর ইলিয়াস শাহী শাসনামলের ইতিহাসখ্যাত নায়ক সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহের স্বর্ণযুগের সোনারগাঁ এ দেশের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে আসন পাওয়া একটি স্থান। যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী স্থান, স্থাপনা, নিদর্শন। সোনারগাঁয়ের এমনই একটি উল্লেখযোগ্য স্থান বারদী। সোনারগাঁয়ের চারদিকে নদী বিধৌত বিশাল অঞ্চলের পূর্ব প্রান্তে মেঘনা নদীর উত্তর পাশে যে অঞ্চল অবস্থিত, তারই নাম বারদী। ইতিহাসখ্যাত সোনারগাঁয়ের প্রসিদ্ধ গ্রাম বারদী।
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম
বর্তমান বারদীর ব্যাপক পরিচিতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাধক পুরুষ শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমের কারণে। এ মহাপুরুষ আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বছরের অধিক সময় আগে বারদীতে এসে আসন তৈরি করেন। প্রতিদিন শত শত ভক্ত পুণ্য লাভের আশায় দূরদূরান্ত থেকে বারদীতে আসেন। আর ব্রহ্মচারীর তিরোধান দিবস ১৯ জ্যৈষ্ঠ উপলক্ষে হাজার হাজার সনাতন ধর্ম অবলম্বীর মিলনমেলায় পরিণত হয় বারদী। শুধু দেশ নয় ভারত কিংবা নেপাল থেকেও ভক্তরা আসেন, বারদীতে। আশ্রমের দক্ষিণ পাশে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে বিশাল মাঠ আর উত্তর পাশে এর কোলঘেঁষে বয়ে চলেছে ছাগল বামনী নদী।
জ্যোতি বসুর বাড়ি ও নাগ জমিদার বাড়ি
উপমহাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুর পৈতৃক বাড়ি এ বারদীতে। ভারতের জননন্দিত এ নেতার বাড়িটি নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে তার পুরনো বাড়ির পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে নতুন স্থাপনা যেখানে রয়েছে জ্যোতি বসু স্মৃতি পাঠাগার। যারাই বারদীতে আসেন, তারা জ্যোতি বসুর বাড়ি পরিদর্শন করে যান।
ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু নাগ জমিদারদের দোর্দণ্ড প্রতাপের কেন্দ্রস্থল ছিল বারদী। বারদীতে নাগ জমিদারদের পুরনো আমলের বাড়িগুলো আজও সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বারদীর একটি ছোট্ট গ্রামের নামই নাগ পাড়া। প্রায় সোয়া’শ বছরের পুরনো নাগ মন্দিরের ভগ্নাবশেষ এখনও বারদীতে দেখতে পাওয়া যায়।
লালপুরী শাহের নুনেরটেক ও স্বপ্নীল মায়াদ্বীপ
সোনারগাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মেঘনা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা একটি চর যার নাম নুনেরটেক। বারদী ইউনিয়নের অন্তর্গত একটি গ্রাম। এ গ্রামে রয়েছে সাধক পুরুষ হজরত নরুল ইসলাম লালপুরী শাহ (রা.)-এর মাজার। লালপুরীর ওরশ উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এখানে জমায়েত হন। নুনেরটেকের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে বারদীর অংশে রয়েছে ছটাকিয়া ঘাট যা এক সময় নদীবন্দর হিসেবে বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানি বিশাল এলাকাজুড়ে বালু ফেলে রিভারভিউ প্রকল্প করেছে। শত বছরের পুরনো চর নুনেরটেক হলেও তার কোলঘেঁষে প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে জেগে ওঠে আরেকটি ছোট্ট চর যা গুচ্ছগ্রাম, রঘুনারচর ও সবুজবাগ নামে পরিচিত। এ চরের দৃশ্য যেন মনপুরাকে হার মানায়। মেঘনার বুকে বিশাল বালুকাময় স্বপ্নীল দ্বীপ, যেন বাংলার সেন্টমার্টিন। স্থানীয় সুবর্নগ্রাম ফাউন্ডেশন এর নাম দিয়েছে মায়াদ্বীপ।
অনিন্দরূপের সাজে বারদী
সমুদ্রের প্রকৃত রূপের দেখা না মিললেও বিশাল জলরাশি মানুষের মনকে দোলা দেয়। বিস্তীর্ণ জলরাশির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা যেতে পারে বারদী আনন্দবাজার রাস্তার প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। যার এক পাশে মেঘনার শাখা নদী, বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ফলে রাস্তা থেকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত কেবল বিস্তীর্ণ জলরাশিই দেখা যায়। রাস্তাটির বারদী প্রান্তে একটি পুরনো মাঠ, পেছনে শত বছরেরও অধিক পুরনো বারদী হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ যা পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। তার সামনেই রয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা যা ‘রূপায়ণ প্যালেস’ নামে পরিচিত। রাস্তার মাঝামাঝি রিবর খালের ওপর ব্রিজ, যার ওপর দাঁড়ালে একদিকে জলের সমারোহ আর অপরদিকে বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর খুবই মনোরম।
বারদীর বিখ্যাত প্যারা সন্দেশ
কিছু বিশেষ খাবারের যেমন এলাকাভিত্তিক খ্যাতি রয়েছে তেমনি ‘প্যারা সন্দেশ’ বিখ্যাত একটি খাবারের নাম। বারদীতে যারাই আসেন তারা এ সন্দেশ খেতে কিংবা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে কখনও ভুল করেন না। গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি এ বিশেষ ধরনের সন্দেশের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি স্বাদ।
যেভাবে যাওয়া যেতে পারে
ঢাকার গুলিস্তান বা সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বাসযোগে বারদী যাওয়া যেতে পারে। অথবা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর স্ট্যান্ড থেকে সিএনজি বা স্কুটারে করে অথবা সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা থেকে সিএনজিতে বারদী যাওয়া যায়। জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা খরচে সহজেই ঘুরে যাওয়া যেতে পারে ঐতিহ্যবাহী বারদী থেকে।
কালের কন্ঠ

পড়া হয়েছে ১২৮ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ