মায়ানমার বাংলাদেশের স্বার্থের বিপরীতে ব্যবহৃত হওয়ার ক্ষেত্র প্রায় প্রস্তুত

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৭, ৫:৩২ অপরাহ্ণ

 মাহবুবুল আলম তারেক:

ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে পরাশক্তির নৌআধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে মায়ানমার বাংলাদেশের স্বার্থের বিপরীতে ব্যবহৃত হওয়ার ক্ষেত্র প্রায় প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে জ্বালানী ও কৌশলগত শক্তি ভারসাম্য সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় কার কার কী অবস্থান ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পৃক্ত তা আমাদের আশু মনোযোগের দাবিদার।

বাংলাদেশের জন্য মায়ানমার-চীন সম্পর্কের নানান দিকগুলো সেই প্রাসঙ্গিতকায় পাঠ করা জরুরি।সম্পর্কের মোড়বদল বা নতুন শর্তযুক্ত হলে কী ধরণের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে তাও আগাম আন্দাজ করতে না পারলে আমাদের নিরাপত্তা ভাবনা এবং পররাষ্ট্রনীতির অভিমুখ নির্ণয় করা অসম্ভব। কারণ মায়ানমার ইস্যুতে এর আগের যে কোনো সময়ের চাইতে আমরা এখন অনেক বেশি নাজুক অবস্থার মধ্যে আছি।

অনেকেই প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য আর ভরকেন্দ্রের জায়গাগুলো গুলিয়ে ফেলছেন। বাস্তব স্বার্থগত সম্পর্কের জড়াজড়ি আর মেরুকরণের গতিপ্রক্রিয়ায় নতুন যে উপাদানগুলো যুক্ত হতে পারে বা হচ্ছে তার দিকে নজর রাখছেন না। অতিসরলীকরণ আর গৎবাধা সূত্র দিয়ে সবকিছু বোঝাপড়ার চেষ্টা আমাদের রাজনীতিক বিশ্লেষণে ধরাবাধা একটা প্রকট প্রবণতা।

সেখান থেকে বের হয়ে এসে তথ্য-উপাত্ত নির্ভর বিশ্লেষণের সাথে পরাশক্তির প্রতিযোগিতা এবং দ্বন্দ্বের মধ্যে উদ্ভূত বিষয় থেকে নিজেদের বিপদগুলো নির্মোহভাবে শনাক্ত করা দরকার।

একই সাথে সম্ভাব্য মিত্র অনুসন্ধান ও নিরাপত্তা ভারসাম্যের অনুকুল পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের কাজও করতে হবে এই বাস্তব পরিস্থিতির ভেতরেই। আর কূটনীতির পাশাপাশি সবচাইতে জরুরি বিষয় জনগণকে সাথে নিয়ে, সমগ্র পরিস্থিতি জানিয়ে গণপ্রতিরক্ষার চর্চায় রক্ষাকবচ প্রস্তুত করা।

মায়ানমার ও চীন পরস্পরকে “সহদোর” হিসাবে সম্বোধন করে যা থেকে তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা অনুমান করা যায়। আর মায়ানমারের দিক থেকে ঐতিহাসিকভাবেই চীন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী কারণ চীনের সাথে তার ১৩৪৮ মাইলের এক বিশাল সীমান্ত রয়েছে। তবে দেশটিতে সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্কের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।

সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, জাপান ও অন্যান্য বহুমুখী দাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নেয় এবং এমনকি কয়েকটি পশ্চিমা দেশ অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করে। ফলে মায়ানমার তার টিকে থাকার জন্য চীনমুখী নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

চীনের সাথে মায়ানমারের দুই লাইনের সম্পর্ক ছিল, দ্বিরাষ্ট্রিক সম্পর্ক এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে বার্মিজ কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক। চীনা বিপ্লবের পর কমিউনিস্টদেরকে সহায়তার কারণে চীনের সাথে মায়ানমারের দ্বিরাষ্ট্রিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তবে ১৯৮৫ সালে চীন মায়ানমারের কমিউনিস্টদেরকে সহায়তা দেয়ার নীতি ত্যাগ করে এবং ১৯৮৮ সালে মায়ানমারের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার এক বছর পরই এক আভ্যন্তরীণ কোন্দলে বার্মিজ কমিউনিস্ট পার্টিও খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। এই সুযোগে সামরিক সরকার সীমান্তবস্থিত কমিউনিস্ট গোষ্ঠীসমূহের সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে সমর্থ্য হয়।

রাস্তাঘাট নির্মাণ, পাওয়ার স্টেশন স্থাপন, স্কুল, হাসপাতাল স্থাপন, বাণিজ্যিক সুবিধাপ্রদান এবং সীমান্ত-বাণিজ্য প্রভৃতি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার বিনিময়ে কমিউনিস্টরাও তাদেরকে সহযোগিতা করার নীতি গ্রহণ করে। এবং এর পরপরই থান শুয়ে ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে চীন ভ্রমণ করেন এবং বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেন।

এর পর থেকেই মূলত মায়ানমার পরাশক্তিসমূহের নিকট থেকে অস্ত্র আমদানি না করে নিরপেক্ষ থাকার যে নীতি ছিল তা ত্যাগ করে এবং চীনের অস্ত্র দিয়ে তার সেনাবাহিনীকে আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। একই সাথে চীনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তার আশ্বাসও আদায় করতে সক্ষম হয়। ফলে অল্পকিছুদিনের মধ্যেই জোটনিরপেক্ষ মায়ানমার চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়।

এমনকি অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বর্তমানের এই কথিত বেসামরিক সরকারও তার টিকে থাকার জন্য সম্পূর্ণতই চীনের উপর নির্ভরশীল। কারণ পর্দার আড়ালে সেনাবাহিনীই সব কলকাঠি নাড়ছে। যে কারণে অনেকে আবার বলে যে মায়ানমার চীনের একটি মক্কেল-রাষ্ট্রে (client-state) পরিণত হয়েছে।

চীন মায়ানমারের তিনটি ক্ষেত্রে তার অর্থনৈতিক সহায়তা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়োজিত করে- অবকাঠামো উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনৈতিক উদ্যোগকে সহায়তা প্রদান এবং জ্বালানী খাত।

চীন মায়ানমারের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে সহায়তা প্রদান করে তার মধ্যে “আইয়াওদ্দা সড়ক প্রকল্প’’(Ayeyawaddy Transportation Project) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ইউনান থেকে মায়ানমারের ইয়াংগুনের থিলওয়া বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধনই এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। এর অধীনে ভামো পর্যন্ত নদীপথের ড্রেজিং করা, ভামোতে একটি কন্টেইনার পোর্ট নির্মাণ করা এবং সেখান থেকে চীনের সীমান্ত বন্দর মুজে বা লিউজেল পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এর মূল উদ্যেশ্য হচ্ছে মায়ানমারের মধ্যদিয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান সাগরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সাথে চীনাদের বাণিজ্যের পরিবহন খরচ ও সময় অনেক বেঁচে যাবে, এবং মালাক্কা প্রণালীর সংঘাত এড়িয়ে চলা যাবে। তাছাড়া বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও সহজেই প্রবেশ করা যাবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে মায়ানমারের সমুদ্র সীমা নিয়ে সমস্যার জন্য চীনের কৌশলগত অবস্থান ও গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রে যে কোনো সংঘাত সৃষ্টি হলে তাকে কেন্দ্র করে ভারত-মার্কিন নৌশক্তি সমাবেশের পাল্টা চীন কি ধরণের তড়িৎ পদক্ষেপ নিতে পারে এটাও আমরা চীনের এই কৌশলগত সামরিক ভারসাম্য স্থাপন চেষ্টা থেকে অনুমান করতে পারব।

চীন বর্তমানে মায়ানমারের ভোগ্যদ্রব্য, কাঁচামাল ও মেশিনারি যন্ত্রপাতির প্রধান সরবরাহকারী এবং চীনও মায়ানমারের জন্য একটি বড় রপ্তানি বাজার। মায়ানমার চীনে তার কাঠ, কৃষিপণ্য, খনিজ দ্রব্যাদি, এবং সম্প্রতি তেল গ্যাসসহ প্রভৃতি পণ্য রপ্তানি করে থাকে। ফলে একদিক থেকে চীন থেকে আমদানি ছাড়া মায়ানমারের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা মেটানো যেমন অসম্ভব তেমনি অন্যদিকে চীনে রপ্তানি না করতে পারলে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রারও ঘাটতি দেখা দেবে।

অধিকন্তু চীন মায়ানমারের অবকাঠামো, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনীতিক উদ্যোগ এবং তেল ও গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্রে একটা বিশাল পরিমাণ অর্থনৈতিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিনিয়োগ সরবরাহ করে থাকে। এমনকি চীনের সহায়তা ছাড়া মায়ানমার সরকার তার ব্যপক হারে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা, যেমন টেক্সটাইল মিল ও চিনির কলসমূহ স্থাপন বাস্তবায়ন করতে পারত না। যদিও চীনের বৈদেশিক বিনিয়োগ খুব বেশি নয় তবুও সাম্প্রতিককালে তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে এর বিনিয়োগ চোখে পড়ার মতো এবং চীনা উদ্যোগসমূহ অচিরেই মায়ানমারের দ্রুত বেড়ে চলা এই সেক্টরের প্রধান নিয়ন্ত্রণকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হবে। ফলে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে মায়ানমারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চীনের সাথে এর অর্থনৈতিক সম্পর্কের উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

যাই হোক, তারপরও চীনের সাথে এই ভারসাম্যহীন বাণিজ্য মায়নমারের বৃহদায়তন অর্থনেতিক উদ্যোগ ও শিল্পউন্নোয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক কোন অবদান রাখতে ব্যার্থ হচ্ছে। চীনে মায়ানমারের রপ্তানি পণ্যের ৭০ ভাগই হচ্ছে কাঠ। কাঠ ও অন্যান্য প্রধান রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে যে অন্যান্য পণ্যদ্রব্য যেমন শিম, ডাল ও গার্মেন্টস প্রভৃতি রপ্তানি করতে পারলে দেশের ভূমি ও শ্রমসম্পদের ও সদ্ব্যবহার করা যায়, কিন্তু কাঠ রপ্তানি শুধুমাত্র সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের নিঃশেষকরণ।

সন্দেহ নেই চীনের অর্থনৈতিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক ঋণের সরবরাহ বর্তমান সেনা নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতাসীনদেরকেও টিকে থাকতে সহায়তা দিচ্ছে, তথাপি মায়ানমারের সমগ্র অর্থনীতির বিবেচনায় এটা একটা সমস্যারও সৃষ্টি করছে। সে জায়গা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবে মায়ানমার সেটা দেখার বিষয়। কিংবা আদৌ তারা সে জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন হতে পারে।

মোটের উপর চীনের সাথে সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক মায়ানমারের বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞর মধ্যে টিকে থাকার হাতিয়ারই হিসাবেই যতটা সুযোগ করে দিয়েছে তার তুলনায় কিন্তু মায়ানমারের বৃহদায়তন অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকা রাখতে পারবে না কিনা সেটাও বিচার্য।

আর সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশেও একটি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পে চীন ৭৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এছাড়া সেখানে একটি শিল্প পার্ক এবং একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলারও পরিকল্পনা আছে চীনের। ফলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলিমদের মানবিক ইস্যুর চেয়েও এই বিনিয়োগকেই অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।

এই দিকগুলোর সাথে সাথে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বিশ্বরাজনৈতিক গুরুত্ব এবং সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের চাপে শক্তিভারসাম্যেও যে সমীকরণ তৈরি হচ্ছে তাতে মায়ানমার বেশ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ইতোমধ্যেই দখল করে নিয়েছে। চীন-পাকিস্তান জোট ও ভারত-মার্কিন জোটের আবির্ভাবের ফলেও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। এই সবগুলো দিক বিবেচনায় রেখে আমাদেরকে সেই নিরিখেই সাবধানতার সঙ্গে মায়ানমারের সঙ্গে পররাষ্ট্রীয় সম্পর্কের নীতি নির্ধারণ করতে হবে।

মাহবুবুল আলম তারেক
লেখক ও সাংবাদিক

পড়া হয়েছে ১২০ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ