রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ

অক্টোবর ৪, ২০১৭, ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ
ফাইল ছবি

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ।

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির দফতরের মন্ত্রী খিও টিন্ট সোয়ের কাছে হস্তান্তর করা চুক্তিতে এ প্রস্তাব দেয়া হয়। সোমবার এ চুক্তির খসড়া মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফরকালে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনে সীমান্তে লিয়াজোঁ অফিস স্থাপনে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে।

অপরদিকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে আগামী ১৫ অক্টোবর দু’দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমেদ হামিদ জাহিদি। এছাড়া তুর্কেমেনিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও উজবেকিস্তানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।

বাংলাদেশের যুক্তি হল ১৯৯১-৯২ সালে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এবারও যাতে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয় সেটাই চাচ্ছে বাংলাদেশ।

বৈশ্বিক চাপের মুখে মিয়ানমারের মন্ত্রী খিও টিন্ট সোয়ে সোমবার ঢাকায় এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মিয়ানমারের মন্ত্রী বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের একাংশকে ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দেন।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হলে মিয়ানমারের তরফে বলা হয়, গত বছরের অক্টোবরের পর যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন; শুধু তাদেরই ফিরিয়ে নেয়া হবে। নতুন রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বিশেষ করে যাচাই কাজে সহযোগিতার লক্ষ্যে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের ব্যাপারে দুই দেশ একমত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে আগে থেকেই তিন লাখ রোহিঙ্গা আছে। গত বছরের অক্টোবরে মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গি হামলা হলে নয়জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। তার জের ধরে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ ও বাড়িঘরে আগুন দেয় সেনাবাহিনী। ওই সময়ে প্রায় ৯০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তারপর ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে ৩০টি স্থানে একযোগে হামলা হলে ১১ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। তারপর মিয়ানমার ফের রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্ঠুর ও বর্বর কায়দায় দমন-পীড়ন শুরু করে। তারপর এক মাসের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। আগের ও বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় নয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন।

জানতে চাইলে ঢাকার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর, জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি), জাতিসংঘ শিশু তহবিলসহ (ইউনিসেফ) জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বর্তমানে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ফলে তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো কঠিন। তাছাড়া জাতিসংঘের সংস্থাগুলো না থাকলে মিয়ানমার যাচাই প্রক্রিয়ার বিলম্ব করতে পারে। মিয়ানমার থেকে আসা অনেক রোহিঙ্গাকে অস্বীকার করতে পারে। এসব কারণেই জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তি ছাড়া রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

সূত্রটি আরও জানায়, বাংলাদেশের প্রস্তাবিত চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে কীভাবে যাচাই সম্পাদন হবে, প্রতি ব্যাচে কতজন রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো হবে, নাফ নদীর দুই তীরে ক্যাম্প স্থাপন করে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পাদন, রাখাইন রাজ্যে ফিরে গেলে তাদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সবিস্তারে উল্লেখ আছে। কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমার এ ব্যাপারে তাদের মতামত জানানোর পর উভয়পক্ষ সম্মত হয়ে এতে স্বাক্ষর করবে। পাশাপাশি, রোহিঙ্গাদের যাচাইয়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হবে। এই পুরো বিষয়টি এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে বাংলাদেশ আশা করছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমারের মন্ত্রীর সফরকালে যা হয়েছে তা যদি মিয়ানমার বাস্তবায়ন করে তবে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, মিয়ানমার পুরোটাই করেছে বৈশ্বিক চাপের কারণে। রাখাইনে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ায় দেশটিতে পশ্চিমা পর্যটকদের ভ্রমণ গত বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। নতুন বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি বোঝার জন্য বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে। এসব কারণে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আগ্রহী করতে চাপের মধ্যেই রাখতে হবে। এ কারণে বাংলাদেশ মনে করে, রাখাইন পরিস্থিতির ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এক মাসের মধ্যে ফের বৈঠকের আয়োজন করা উচিত। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হবে। এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো দেয়ার সমস্যা থাকায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাধারণ পরিষদে সহজেই রাখাইনে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান সংবলিত প্রস্তাব পাস করানো সম্ভব। এটা সবাই বিশ্বাস করেন যে, মিয়ানমারের ওপর থেকে চাপ সরে গেলে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে না। কারণ তারা পরিকল্পিত উপায়ে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করেছে।

নিরাপত্তা সহযোগিতা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আসন্ন মিয়ানমার সফরের লক্ষ্যে মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। মিয়ানমারের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনের লক্ষ্যে ওই সময়ে একাধিক এমওইউ সই হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরের লক্ষ্যে দেশটির পক্ষ থেকে সোমবার আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত না হলেও শিগগিরই এ সফর অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় যেসব এমওইউ সই হবে তার মধ্যে সীমান্ত এলাকায় ‘বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস’ (বিএলও) চালু অন্যতম। সীমান্তে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্তের দু’পাশে দুই লিয়াজোঁ অফিস যোগাযোগ করে তা নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। এই স্মারক সই করার প্রস্তাব বাংলাদেশই করেছে।

সূত্র মতে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ নিরসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে নিয়মিত নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠানে আলাদা একটি এমওইউ সই করার চেষ্টা করা হবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতি বছর এমন নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যা সমাধান সহজ হবে। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকালে দু’দেশের মধ্যে কিছু ডকুমেন্ট অনুস্বাক্ষরের বিষয় আলোচনা হবে।

যুগান্তর

পড়া হয়েছে ৫৭ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ