অস্থিরতা ও অবক্ষয়ে স্বজনের রক্তে রঞ্জিত হাত

নভেম্বর ৪, ২০১৭, ১:১২ অপরাহ্ণ
রাজধানীর কাকরাইলে বৃহস্পতিবার পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন মা-ছেলে। এর কয়েক ঘণ্টা না যেতেই বাড্ডায় হত্যার শিকার হন বাবা-মেয়ে। বছরজুড়েই এমন নৃশংসতায় বলি হয়েছেন আরও হাজারেরও বেশি শিশু-নারী-পুরুষ।
পুলিশের হিসাবে শুধু দেড় মাসেই ২৯ হত্যাকাণ্ডে রক্তে ভিজেছে স্বজনের হাত। নগর-মহানগর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ঘটা এসব ঘটনা নতুন করে বাড়িয়েছে উদ্বেগ।
কেন ঘটছে এসব? এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থ-সামাজিক কারণে পারিবারিক বন্ধনগুলো বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও আকাশসংস্কৃতি। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ঘাটতি, আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন ও অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ক্রমশ মানুষকে হিংস্র করে তুলছে।
কথাসাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক যুগান্তরকে জানান, বিশ্বে সামাজিক প্রেক্ষাপট খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। প্রতিনিয়তই চাহিদা বাড়ছে মানুষের। লোভ-লালসা বাড়ছে, খারাপ বাসনা বাড়ছে। এসব আমরা সামাজিক-পারিবারিকভাবে দমিয়ে রাখতে পারছি না। এখন কেউই ধৈর্য ধরতে, সময় দিতে রাজি নয়। মানুষ যা কিছুই চাচ্ছে, তা সঙ্গে সঙ্গে পেতে মরিয়া হয়ে উঠছে। না পেলেই হিংস্র হয়ে উঠছে।
আমাদের দেশের আইন দুর্বল, বিচার ব্যবস্থা খুবই ধীরগতির। এটিও এসব ঠেকানোর অন্তরায় বলে মনে করেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। তিনি বলেন, ঘটনার পর অনেক গ্যাঞ্জাম হয়, লেখালেখি হয়, তদবির হয়, ঘুষঘাস চলে, এক সময় মুখ বন্ধ হয়ে যায়। আইন কঠিন হলে, বিচার দ্রুত হলে এর প্রবণতা কমে আসত।
আনোয়ারা সৈয়দ হক আরও বলেন, দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ধৈর্য নেই। ঝগড়া লেগেই থাকে, যার বলি হয় শিশুরা। এ সমাজের মা-বাবারাই অস্থির। ফলে সন্তানদের নিয়ে তাদের সন্দেহের শেষ নেই। সন্তানরাও মা-বাবাকে অবিশ্বাস করতে শিখছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে জানান, ‘সমাজে উচ্ছৃঙ্খলতা খুব বেশি। নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটছে। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে মানুষকে অনেক সচেতন হতে হবে। তবেই অন্ধকার কাটবে। পারিবারিক কলহে খুন-খারাবি পুলিশ কি করে নিয়ন্ত্রণ করবে, ওটা পারিবারিক ও সামাজিকভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
তবে পুলিশের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, খুনের বিষয়ে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তাতে ব্যর্থ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। পুলিশ ও আইন আরও কঠোর হলে অনেক কমবে এসব।
ধর্মীয় ও সামাজিক আচার হারিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। আর অস্থিরতা থেকেই এমন বর্বর ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে সমাজ ও পরিবারের ভেতর পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ঢুকে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব ধ্যান-ধারণা বিকৃতভাবে গ্রহণ করছে আমাদের সমাজ। মানুষ পারিবারিক বন্ধন ভুলতে বসছে। গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন থেকে সরে পড়ছে। খেলাধুলা, বিনোদন নেই বললেই চলে। ফলে মানুষ দারুণভাবে হতাশাগ্রস্ত ও অস্থির জীবনযাপন করছে। যে কারণে উনিশ থেকে বিশ হলেই নৃশংসতা ঘটাচ্ছে। প্রিয় মানুষটিকেই হত্যা করছে।
আইনের শাসন নেই, আইনের প্রয়োগ নেই বলে জানান বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এলিনা খান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এমন নৃশংস হত্যার বিচারও দ্রুত হচ্ছে না। নানা চাপে মীমাংসা হচ্ছে। সাক্ষী যেমন সাক্ষী দিতে চায় না, তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও যথাযথ তদন্ত করছে না। ফলে পারিবারিক সহিংসতা ও খুনাখুনি বাড়ছে।
এলিনা খান আরও বলেন, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়াও বড় কারণ। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব, বিকৃত টিভি সিরিয়াল এবং সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবে এসব ঘটনা ঘটছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দুর্বল আইনি ব্যবস্থার কারণেই সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০ নামে একটি আইন পাস করা হয়েছে। কিন্তু আইনটির যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। আবার আইনটিতে সাজা খুবই কম। এ আইনে কেউ অপরাধ করলে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এ আইনে কেউ অপরাধ করলে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যেভাবে পারিবারিক অশান্তি হচ্ছে তাতে এ আইনের ধারা পরিবর্তন করতে হবে। অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। তাহলে সামাজিক অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় যুগান্তরকে জানান, এসব হত্যা পরিবারের ভেতরে ঘটায় পুলিশের কিছুই করার থাকে না। তবে সমাজের অন্য দশটি সচেতন মানুষের মতো পুলিশও বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষকে সচেতন করে তুলতে দিন-রাত কাজ করছে। সাংসারিক জীবনে পরস্পর বিশ্বাস থাকতে হবে। শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। এছাড়া বেশিরভাগ ঘটনায় পারিবারিক খুনাখুনির নেপথ্যে আছে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ। অসুন্দর সম্পর্ক, পরকীয়া। মানুষের মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হলে এমন বর্বর ঘটনা-সহিংসতা কমে আসবে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২ হাজার ৭১১টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫৯১, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ৩৬, ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৫১৪ এবং ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৩৯৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসবের অধিকাংশই পারিবারিক কারণে ঘটেছে।
এ বছরের ১০ জানুয়ারি দারুস সালামে ২ সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন মা। একই দিনে গুলশানে স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী। ১৫ ফেব্রুয়ারি মালিবাগে স্বামীকে হত্যা করে স্ত্রী। ৯ জুন তুরাগে খুন হন মাসহ তিন সন্তান। ১৭ সেপ্টেম্বর মিরপুরে স্ত্রীকে খুন করার অপরাধে স্বামীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২৬ অক্টোবর বরিশালের চরবাড়িয়ায় ২ ছেলে ও স্ত্রীর হাতে খুন হন স্বামী।
২৭ সেপ্টেম্বর বগুড়ার গাবতলীতে স্বামীকে হত্যা করে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখেন তার স্ত্রী বানু আক্তার। ২৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ছোট ভাই তার বড় ভাইকে খুন করে। মেহেরপুরের গাংনীতে ২০ সেপ্টেম্বর স্বামীর সঙ্গে কলহে ২ বছরের শিশু সন্তানকে হাত-পা বেঁধে পুকুরে ফেলে হত্যা করে স্ত্রী।
গত বছরের ১৮ এপ্রিল উত্তরখানে দেড় বছরের শিশুকে পেট কেটে হত্যা করে মা। ২০১৫ সালে মিরপুরে স্বামীকে হত্যা করে স্ত্রী। ২০১৩ সালের আগস্টে রাজধানীতে পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীকে হত্যা করে একমাত্র মেয়ে ঐশী।
২০১৫ সালের মার্চে কক্সবাজারের চকোরিয়া এলাকায় আবদুল গণি-ফাতেমা দম্পতির তিন শিশুকন্যা আয়েশা, শিউলী ও জান্নাতের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই বছরের ৪ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইল উপজেলায় নিজ ঘর থেকে মা ও শিশু সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়।
গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পূর্ব গোসাইলডাঙ্গা এলাকায় মাকে কুপিয়ে হত্যা করে ছেলে। শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মা-বাবার হাতে খুন হয়েছে ১৩ শিশু।
যুগান্তর

পড়া হয়েছে ৭২ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ