এসব ছবির দরকার কী?

নভেম্বর ৯, ২০১৭, ১:৪০ অপরাহ্ণ
ছবির ব্যবসা হচ্ছে না, হলে দর্শক আসছে না, বিনিয়োগকারী চলচ্চিত্র শিল্পে বিনিয়োগ করতে চাইছে না- এমন অনেক হচ্ছেনার মধ্য দিয়ে যেগুলো নিয়মিতই হচ্ছে তা হল অখাদ্য টাইপের ছবি নির্মাণ। যারা উল্লিখিত কথাগুলো নিয়মিত আওড়ান তারাই সেসব অখাদ্য টাইপ ছবি বানিয়ে বিনিয়োগকারী ও দর্শকদের ঢাকাই চলচ্চিত্র বিমুখ করছেন। এসব বিষয় নিয়েই এ প্রতিবেদন। বিস্তারিত লিখেছেন অনিন্দ্য মামুন
বাংলা সিনেমা ও নাটকের ক্ষেত্রে এ দেশের গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। যে কারণে একসময় দর্শক কলকাতার নাটক-সিনেমা দেখলেও এ দেশের নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের প্রতি বিমুখ হননি।
বর্তমান ভারতের বাংলা নাটক-সিনেমার মানুষদের কাছে সমীহের ব্যাপার ছিল এ ভূখণ্ডের বিনোদন জগৎ। এখন আমাদের মঞ্চ নাটককে বেশ গুরুত্ব দিতে হয় তাদের। অথচ মাঝে প্রায় দর্শকশূন্য হয়ে পড়েছিল আমাদের মঞ্চ নাটক।
তবুও এ দেশের মঞ্চ নাটকের ব্যক্তিত্বরা হাল ছাড়েননি। গাঁটের পয়সা খরচ করে হলেও মঞ্চ নাটকের কোয়ালিটি ধরে রেখেছিলেন। তার সুফল এসেছে। এখন আবারও জমজমাট হয়ে উঠেছে মঞ্চাঙ্গন।
শুধু ভারত নয়, ইউরোপ আমেরিকা কিংবা এশিয়া মহাদেশজুড়ে আমাদের মঞ্চ নাটকের সুনাম বিস্তৃত। শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়তো ভাবছেন চলচ্চিত্রের শিরোনাম দিয়ে নাটকের কথা লিখছি কেন?
কারণ মাথা আনতে হলে আগে কান টানতে হয়! মঞ্চ নাটক এখনও সুনাম ধরে রাখলেও টিভি নাটকে হারিয়ে ফেলেছে সে জায়গা। আর চলচ্চিত্রের বিষয়ে কোনো কথাই নেই। পুরোটাই উল্টো চিত্র। চলচ্চিত্রের এ উল্টো পথের যাত্রার জন্য দেশের এক শ্রেণীর শিল্পী কলাকুশলী ও প্রযোজকরাই দায়ী।
তবে এ দায় নিতে রাজি নন কেউ। বিষয়টি সেই প্রবাদটির মতোই- চোর যখন চুরি করে তখন সে নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। এ কারণেই এক সময় ঢাকাই চলচ্চিত্রে ধস নেমে আসে। থাবা পড়ে অশ্লীলতার। এতেই দেশীয় চলচ্চিত্র বিমুখ হয়ে পড়েন দর্শক।
প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছিল সিনেবিজনেস। পরে সরকারের নানা পদক্ষেপ ও দেশপ্রিয় কিছু চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের আন্তরিকতায় দেশীয় সিনেমা অশ্লীলতামুক্ত হয়। তাতে করে কিছু দর্শক আবারও হলমুখী হয়েছেন। কিন্তু সিনেমা পাড়ায় বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
তাই এখন কেউ সিনেমা নির্মাণে এলে তার কাছে আগে জানতে চাওয়া হয়, ছবিটি বাণিজ্যিক সিনেমা হবে নাকি বিকল্পধারার হবে? এ দুই ধারার ভেতরেও আরেকটি তৃতীয় ধারা তৈরি হয়েছে দেশীয় চলচ্চিত্রে।
তারা হলেন, না ঘরকা না ঘাটকা। তারা দু’দিকেই তাল মিলিয়ে ব্রাহ্মণ সাজার চেষ্টা করেন। ধীরে ধীরে তাদের মুখোশও উন্মোচিত হয়ে গেছে সবার সামনে। ওরা শৈল্পিক ছবির নাম করে এমন কিছু সিনেমা বানায় যা শিল্পমানে উত্তীর্ণও হয় না। আবার সিনেমা হলে দর্শকও টানতে পারে না।
কিন্তু ওরা ভিন্ন প্রচেষ্টায় ফিল্মের পুঁজি ফেরত আনেন। এখন কথা হল, পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসায় লাভ করাই যদি উদ্দেশ্য হয় তা হলে বিনোদন দুনিয়াতে ব্যবসা করার দরকার কী? চামড়াশিল্পে কিংবা শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করতেই পারেন।
আপনি এখন যে ছবি বানাচ্ছেন, ছবিটির ব্যাকরণ কিংবা শিল্পমান থাকল না, দু’দিনের বেশি দেশের প্রেক্ষাগৃহেও চলল না, দর্শকও পছন্দ করল না, তা হলে সে ছবি কেন বানাচ্ছেন আপনি? কেনইবা সে ছবিতে অভিনয় করছেন দেশের প্রথম সারির শিল্পীরা।
বেঁচে থাকার জন্য অর্থ দরকার। তার মানে তো এই নয় যে, নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে টাকা অর্জন করে গাড়িতে চলতে হবে। কর্পোরেট আর বিনোদন জগতের মার্কেটিংটা এক পাল্লায় মাপলে তো হবে না। সিনেমাকে শুধু প্রোডাক্ট ভাবলে চরম ভুল করা হবে।
এটা শিল্প। এ শিল্পের জন্যই তারকা বনে যান শিল্পীরা। লাখো লাখো ভক্ত তাদের আদর্শ মানেন। ফলো করেন। এখন অনেকে হা-হুতাশ করে বেড়াচ্ছেন, সিনেমার বাজার ভালো না। অথচ এ খরার বাজারেও বিনিয়োগকারী আসছেন।
সিনেমায় টাকা লগ্নি করছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে একশ্রেণীর নির্মাতারা তাদের ভাঙিয়ে খাচ্ছেন। টাকা ঠিকই ঢালছেন কিন্তু সিনেমা তারা বানিয়ে দিচ্ছেন না। বানাচ্ছেন ‘ছিঃ নেমা’।
সিনেমা না বানালে যতটা না ক্ষতি হতো তার বেশি এ ধরনের নিন্মমানের সিনেমা বানিয়ে ক্ষতি করছেন তারা। এ বছর প্রায় অর্ধশত ছবি মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে কয়টি ছবিকে মানদণ্ডের বিচারে সিনেমা বলা যাবে?
বিষয়টি ভাবতে গেলেই হাতেগোনা কয়েকটি ছবির নাম মনে পড়বে। বাকি সিনেমাগুলোকে তা হলে কী নাম দেবেন আপনি? গত সপ্তাহে ‘কপালের লিখন’ নামে একটি ছবি মুক্তি পেল।
অথচ মুক্তির আগের দিনও ছবিটি সম্পর্কে জানতেন না কেউ। এটি পরিচালনা করেছেন জুয়েল ফারসী। অভিনয় করেছেন সংগ্রাম খান, সানজানা, মাসুম আজিজ, অনন।
অথচ মাসুম আজিজ ছাড়া এ ছবিতে আলোচিত কিছুই নেই। প্রতিবেশী দেশ যখন তাদের উন্নত প্রযুক্তির ছবি দিয়ে আমাদের বাজার দখল করছে ঠিক এ সময়ে এ ধরনের ছবি নির্মাণ এবং এগুলো মুক্তি দেয়া শুধু সিনেমার দর্শকদের বিমুখ করা নয়, দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা করাও।
গত মাসে মুক্তি পেল আলী আজাদ পরিচালিত ‘ষোলো আনা প্রেম’। ছবিটি নির্মাণ নিয়ে কথা হয়েছে অনেক।
এতে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক সাইমন। অথচ ছবিটির শুটিং কবে শেষ হয়েছে নায়ক নিজেই জানতেন না। জানতেন না মুক্তির বিষয়টিও। শুরুটা ভালো হলেও পরবর্তীতে ছবিটি সেভাবে নির্মাণ হয়নি।
এতে তানিয়া বৃষ্টি, নির্জনা, কাজী হায়াৎ, মিজু আহমেদও অভিনয় করেছেন। এ বছর মুক্তি পাওয়া আরও একটি ছবি হচ্ছে ‘এক পলকের দেখা’। বাংলাদেশি এ আর রহমানের নির্মাণ এটি।
অভিনয় করেছিলেন মেহেরাজ মেহেদী, সাবনীড়, সালমান জাফরি, রেবেকা, সুব্রত প্রমুখ। প্রেক্ষাগৃহে পোস্টার ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি এর।
ফেসবুক ভাইরাল হিরো আলমকে নিয়ে ছবি বানিয়েছেন নির্মাতা মঈন বিশ্বাস। ছবির নাম ‘মার ছক্কা’। যা ছবি নয়, হাস্যরস হিসেবেই দর্শকদের কাছে পরিগণিত হয়েছে।
এতে রোহান, আলেকজান্ডার বো, হিরো আলম, রাভিনা, ওমর সানী, অরুনা বিশ্বাস, সাদেক বাচ্চু অভিনয় করেছিলেন। ওমর সানী, রেসি ও তুরাজ খানকে নিয়ে পরিচালক বন্ধন বিশ্বাস নির্মাণ করেছিলেন ‘শূন্য’।
মুখ থুবড়ে পড়েছে ছবিটি। পরিচালককে এমন ছবি আর না বানাতেও অনেকে দাবি তুলেছিলেন ফেসবুকে।
এ ছাড়া সাফি উদ্দীন সাফির ‘মিসড কল’, বদরুল আমিনের ‘সত্যিকারের ভালোবাসা’ মুন্তাহিদুল লিটনের ‘শেষ চুম্বন’ ও রকিবুল আলম রকিবের ‘মাস্তান এবং পুলিশ’, মনতাজুর রহমান আকবরের ‘দুলাভাই জিন্দাবাদ’ ছবিগুলো দর্শক টানা দূরের কথা দর্শকদের ঢাকাই ছবির প্রতি বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করেছে।
আগামীকালও সপ্তাহেও ‘খাস জমিন’ নামের এটি ছবি মুক্তি পাচ্ছে। এতে নায়ক সাইমনের বিপরীতে অভিনয় করেছেন বিপাশা কবির। দু’জনই ঢাকাই ছবির সম্ভাবনাময় অভিনয় শিল্পী।
ইতিমধ্যে ছবিটির কয়েকটি গান ও ট্রেলার প্রকাশ পেয়েছে। তাতেই বোঝা গেছে ছবিটির প্রধান দুই চরিত্রকে কতটা টেনে নিচে নামানো যাবে তার সর্বাত্মক চেষ্টাই নির্মাতা করেছেন।
এ শতকে এসে এমন ছবি দর্শকরা কতটা গ্রহণ করেন সেটি বিচার করেই সিনেমা বানানো উচিত।
অন্যথায় একটি ছবি বানিয়েই লাখ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়ে প্রযোজক দৌড়ে পালাবে। সিনেমা উন্নতি হবে না আমাদের। এখনই সচেতন হওয়া দরকার।
যুগান্তর

পড়া হয়েছে ৫৩ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ