অ্যান্টিবায়োটিকের ভয়ানক বিপদে বাংলাদেশের মানুষ

নভেম্বর ১৬, ২০১৭, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

‘রোগীকে আইসিইউতে পাঠিয়ে স্বজনরা আশায় বুক বাঁধে তার নতুন জীবনের। চিকিৎসকরাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন রোগীকে বাঁচানোর।

কিন্তু একটা পর্যায় পর্যন্ত গিয়ে চিকিৎসকদের আর কিছুই করার থাকে না, রোগীর মৃত্যুর ক্ষণটুকু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া। কারণ ওই রোগীর শরীরে আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। অর্থাৎ সব জীবাণুই ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। একজন চিকিৎসক হিসেবে তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। দিনে দিনে এমন পরিণতি বেড়েই চলছে। ’ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বললেন এসব কথা। বাংলাদেশে মানুষের শরীরে দিন দিন অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ অকার্যকর হয় পড়া এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুগুলোর ভয়ংকর প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপই ঝরল এই অধ্যাপকের মুখ থেকে। চিকিৎসার ভাষায় এ পরিস্থিতিকে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ (অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিবন্ধকতা) বলা হয়।

মেডিসিনের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে সার্জারির রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগই এখন ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬৭ হাজার রোগীর ওপর এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ রোগীই অপ্রত্যাশিত ইনফেকশনে আক্রান্ত ছিল। এটার কারণও অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলেই আমাদের সামনে আজ এমন ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দিন দিন এটা বেড়েই চলছে। এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক বিপণন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা এখন যে কেউ চাইলেই ফার্মেসিতে গিয়ে ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারে। ডোজ মানছে না, নিয়ম মানছে না। যখন ইচ্ছে হলে খাচ্ছে, যখন ইচ্ছে করছে বন্ধ করছে। কিন্তু চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো মতেই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বা সেবন চলবে না।ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, কৃষি ও মাছ-মাংসের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করে। এটাও একটা বড় বিপদ। এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুসারে, দেশে ২০টি জেনেরিকের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আছে। ওষুধ কম্পানিগুলো এসব অ্যান্টিবায়োটিক ৪০০-এর বেশি ব্র্যান্ড আইটেম বাজারে ছেড়েছে। ফলে সবটাই মানুষের হাতের নাগালে উন্মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। আবার ডাক্তাররাও ওষুধ কম্পানির প্ররোচনায় কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই সংরক্ষিত না রেখে সবটাই সাধারণভাবে ব্যবহার করে থাকেন। এতে আরো বিপদ বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই সাত-আটটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক জেনেরিক ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে গেছে। অন্যদিকে মানুষের জন্য হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলেও যথেচ্ছভাবে অতিমাত্রায় ব্যবহার চলছে অ্যান্টিবায়োটিকের। যা মাংসের মাধ্যমে আবার ঘুরে ফিরে ঢুকে যাচ্ছে মানুষের শরীরেই। সব মিলিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের ভয়ানক বিপদে আছে বাংলাদেশের মানুষ। বিশেষ করে কিডনি ও লিভারের ওপর এসব অ্যান্টিবায়োটিকের বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মানবজাতির জীবন রক্ষার প্রধান অস্ত্র হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু এখন অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। আর এই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণগুলো মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হওয়া ছাড়াও সমাজ ও পরিবেশ-প্রতিবেশেও ব্যাপক প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে। তিনি জানান, তাঁরা দেশের ১০টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সংক্রমণ পরিস্থিতি দেখতে সমীক্ষা কাজ শুরু করেছেন।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘ঢাকায় দুই বছর আগে তাঁদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ৫৫.৭০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হচ্ছে। এই দুই বছরে নিশ্চয়ই ওই হার আরো বেড়েছে বলেই মনে করছি। ’

পবা চেয়ারম্যান জানান, বিশ্বে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৫০ শতাংশ কৃষি খাতে ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে কৃষি খাতে ৬৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হচ্ছে। এমন অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল র‌্যাজিস্টান্সের ফলে বিশ্বে ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যাবে বলে ধারণা করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বের কোথাও প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বেচা বা কেনা সম্ভব নয়, কেবল বাংলাদেশেই এটা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে মানুষের জন্য প্রযোজ্য অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়ে থাকে গবাদি পশুর জন্য।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আইনুল হক বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ জন্য আইনও করা হয়েছে। ’

অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ : এদিকে গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলন হলে বিশ্ব অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ (১৩ নভেম্বর থেকে ১৯ নভেম্বর) উপলক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উদ্যোগে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে উপস্থাপিত একটি প্রবন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা জানান, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে ‘সেফালোস্পরিনের’ ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মাত্র আট বছরে এই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে তিন গুণ ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের এক সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে, যা গত তিন বছরে আরো বাড়ার আশঙ্কাই বেশি।

সেমিনারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, প্রোভিসি অধ্যাপক ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফায়েজসহ অন্যরা বক্তব্য দেন। বক্তারা প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধের ওপর জোর দেন।

কালের কন্ঠ

পড়া হয়েছে ৯০ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ