নাগমনি তত্ত্ব: বিজ্ঞানী মিহির বলেন আছে কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে নেই!

নভেম্বর ২৬, ২০১৭, ৫:১৫ অপরাহ্ণ

সাপের শরীরে জমে পাথর হয়ে যাওয়া বিষ কেটে নেওয়া হচ্ছে- ফাইল ছবি

 ফিকশনধর্মী গল্পকথা বা সিনেমায় ‘নাগমণি’ বা ‘সাপের লাল’ নামে অমূল্য রত্নের বিষয় বলা হয় যা থাকে ‘অলৌকিক ক্ষমতাধর’ সাপের মাথায়। কারও কারও মতে এটি সাতরাজার ধন অর্থাৎ সাতজন রাজার ধনসম্পদ একত্রিত করলে যা হয় এটি তার সমতুল্য বা এর মূল্য তারচেয়েও বেশি।

কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, নাগমনিধারী বিষধর সাপ ‘ইচ্ছাধারী’ অর্থাৎ যখন যেমন ইচ্ছা সেই রূপ ধরতে পারে।

গল্পকাহিনীতে নাগমনি বা গজমতি হারের জন্য অসীম সাহসী রাজপুত্র বা কাঠুরিয়াপুত্ররা ভয়াল সব অভিযানে বের হয়। কাহিনীতে দেখা যায়, নাগমনির অধিকারী নাগরাজ বা নাগরানী অনেকসময় যাদুকরের ফাঁদে আটকে থাকে, মনিটা হয়ে যায় হাতছাড়া। এই মনিকে কেন্দ্র করে আগে বাড়ে সিনেমার কাহিনী। গল্পে দেখানো হয় নাগমণির অলৌকিক ক্ষমতার বলে অন্ধ রাজকন্যা দৃষ্টি ফিরে পাবে কিংবা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত রাজা সুস্থ হয়ে উঠবেন!

এই ‘নাগমনি’র সত্যাসত্য নিয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ যাই বলুক- বাস্তবে অনেক মানুষই এতে বিশ্বাস করে। কারণ, রহস্যময় এমন অনেক বিষয় আছে যার যুক্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। এ কারণে, অন্ধবিশ্বাস আর ধারণার মাত্রা দিনদিন বাড়তেই থাকে। নাগমনি আছে কী নেই সেই বিতর্ক এড়িয়ে কালের কণ্ঠের প্রিয় পাঠকবৃন্দ আসুন জেনে নেই ‘রহস্যময় নাগমনি’ সম্পর্কে প্রচলিত কিছু তথ্য-

যারা বিশ্বাস রাখেন সর্পমনি বা নাগমনি আছে তারা দাবি করেন এই রত্নটি এতই ঝলমলে উজ্জ্বল হয় যে এর আশপাশ অমাবস্যা রাতের অন্ধকারেও আলোকিত হয়ে যায়। এর থেকে আলো ঠিকরে বের হয়।

নাগমনি বিশ্বাসীরা আরও মনে করেন যে এই মনি অনেক বছর বয়সী (কমপক্ষে ১০০ বছর) বিষাক্ত সাপের মাথায় তৈরি হয়। সাধারণ সাপ ততদিন বাঁচে না। আর যে সাপের মাথায় মনি তৈরি শুরু হয়- তার পূর্ণতা পেতেও দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়। ততদিনে মানুষের শিকারে পরিণত হয় এদের কেউ কেউ। তাই নাগমনিধারী সাপ খুবই দুর্লভ, দুর্গমতম পাগাড়-জঙ্গলে এদের বাস। এ কারণে চোখে পড়ে না একদম!

কারও কারও মতে, সাপের মনিটি থাকে তার মাথায় আবার কেউ দাবি করে সাপ এই মনিটি মুখে পুরে রাখে যা সময়ে সময়ে বের করে। রাতের অন্ধকারে আলোকিত মনিটিকে ঘিরে পোকা-মাকড়ের সমাগম ঘটে। সাপ সেই পোকা-মাকড় ধরে ক্ষুধা মেটায়। অর্থাৎ, শিকার ধরার সুবিধার জন্য মনিটি ব্যবহার করে তারা।

তাদের কারও কারও মতে, এর সূচনা হয় মশুর ডালের আকারে আর পূর্ণ আকার পেলে মনিটি ময়ূরের মাথার আকারের এবং  আগুনের চেয়ে উজ্জ্বলতর হয়। কেউ বলে- না, এটি কবুতরের ডিমের সাইজের হয়, কেউ বলে বড় একটি মুক্তার আকারের হয়। তারা আরও বিশ্বাস করে যে এই মনি অন্য যে কোনো রত্ন পাথরের চেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। এমন বিশ্বাসও প্রচলিত আছে যে, এই মনি যার কাছে থাকে তার ওপর বিষ বা বিষাক্ত কিছু প্রভাব ফেলতে পারে না এবং তিনি নীরোগ থাকেন।

প্রতীকি চিত্র

তবে আধুনিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিষধর সাপ যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন তার বিষথলিটি শুকিয়ে ক্রমশ পাথরে পরিণত হয়। এর অবস্থান হয়  সাপের মাথার পেছন দিকে। অনেক সাপুরিয়া তা সংগ্রহ করে জরি-বটির কাজে ব্যবহার করে। আমরা জানি, সাপের বিষ থেকে দুর্লভ আর কঠিন রোগের ওষুধ তৈরি হয়। সে মোতাবেক, শুকিয়ে পাথর হয়ে যাওয়া সেই বিষেরও কিছু রাসায়নিক তথা ঔষধি প্রয়োগ থাকতে পারে। এটাকে ভিত্তি করে সাপুড়ে শ্রেণির ধূর্ত লোকেরা সাধারণ মানুষকে বোকা বানায়। সাপের বিষ জমে পাথর হয়ে যায়- এই বিষয়টি নিয়ে যারা পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন, তাদের মতে এই পাথর আলো ছড়ায় না এমনকি এর কোনো উজ্জ্বলতাও নেই।

আর বাস্তববাদীরা মনে করেন, যত দুর্লভই হোক না কেন, অমন ধরনের অলৌকিক ক্ষমতার নাগমনি যদি থাকতোই তবে এতদিনে এর একটি হলেও তো মানুষের নজরে আসতো- তার ছবি প্রকাশ হতো। তা তো হচ্ছে না।

কিন্তু প্রাচীন ভারতের (আনুমানিক ৫০৫ – ৫৮৭) বিখ্যাত দার্শনিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও কবি বরাহমিহির মনে করতেন, যে রাজার দখলে নাগমনি থাকে তিনি শত্রুদের ওপর বিজয়ী হন এবং তার রাজ্যে প্রজারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করে।

গুপ্ত রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত বরাহমিহির তার বৃহৎসংহিতা বইয়ে উল্লেখ করেছেন- মনিধারী সাপের অস্তিত্ব পৃথিবীতে আছে। সাম্প্রতিক কালে সাপের মনি নিয়ে প্রফেসর এনসর নামে এক পশ্চিমা গবেষক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তার মতে, ক্লোরেফেন নামক একধরনের খনিজ পদার্থে কথিত সাপের মনি গঠিত যা তাপ প্রয়োগ করলে এক ধরনের দীপ্তি ছড়ায়।

তবে, প্রাচীন বিজ্ঞানী বরাহমিহিরের কথাও ফেলে দেওয়ার মতো নয় বলে মনে করেন অনেকে। কারণ, আজ থেকে দেড়হাজার বছর আগে তিনি দাবি করেছিলেন যে মঙ্গলগ্রহে পানি আছে। সম্প্রতি নাসার বিজ্ঞানীদের তথ্যে জানা যায় তিনি ভুল বলেননি।

এদিকে, যেসব সাপে নাগমনি থাকে বলে দাবি করা হয়, সেগুলোর বাসস্থান ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও বাংলাদেশসহ এশীয় বিভিন্ন দেশ।

‘সাপ থেকে প্রাপ্ত’ মনি কোবরা পার্ল অথবা নেচারাল পার্ল বলে পরিচিত। সর্পমনিবাদীদের অনেকে দাবি করেন, একশ্রেণির ব্যাঙেরও মনি থাকে যা তারা শিকারের কাজে ব্যবহার করে এবং নীল বা সবুজ রঙর এই মনিটিও মহামূল্য।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ বরাহমিহির
বরাহমিহিরকে আধুনিক ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তাঁর আগে ভারতবর্ষের জ্যোতিবির্জ্ঞানের মূল গ্রন্থ ছিল বেদাঙ্গ জ্যোতিষ, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৪শ শতকে রচিত হয়েছিল। বেদাঙ্গ জ্যোতিষ প্রায় ১৫০০ বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রধান আকরগ্রন্থ (reference) ছিল। কিন্তু বরাহমিহির তাঁর সূর্যসিদ্ধান্ত নামক রচনাতে যে সূর্যকেন্দ্রিক ব্যবস্থার কথা বর্ণনা করেন, তা ছিল অনেক বেশি সঠিক। তিনিই বছর গণনার সময় বৈশাখকে প্রথম মাস হিসেবে ধরার প্রচলন করেন। আগে চৈত্র এবং বৈশাখকে বসন্ত ঋতুর অন্তর্গত ধরা হতো। পৃথিবীর আকার এবং আকৃতি সম্বন্ধে তার সঠিক ধারণা ছিল।

ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানে বরাহমিহিরের জ্ঞান ছিল অনুপুঙ্খ। তার মহাগ্রন্থ পঞ্চসিদ্ধান্তিকায় তিনি প্রথমে ভারতীয় স্থানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধারাগুলির বর্ণনা দেন এবং শেষের দুইটি খণ্ডে পশ্চিমা জ্যোতির্বিজ্ঞান আলোচনা করেন। এগুলিতে গ্রিক ও আলেকজান্দ্রীয় ঘরানার গণনা, এমনকি টলেমীয় গাণিতিক সারণি ও ছকের পূর্ণাঙ্গ রূপ স্থান পেয়েছে।

বরাহমিহিরের রচনায় খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতকের ভারতবর্ষের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে তাঁর মূল আকর্ষণ ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষবিদ্যার প্রতি। তিনি বারংবার জ্যোতিষীবিদ্যার গুরুত্বের ওপর লেখেন এবং এই বিষয়ে বহু নিবন্ধ রচনা করেন, যেমন শকুন-বিষয়ক রচনাবলী এবং রাশিগণনার ওপরতার দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে বৃহজ্জাতক ও লঘুজাতক।

বরাহমিহিরের লেখা জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’। পাঁচ অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থের একটি অংশের নাম ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’। এই গ্রন্থে বিভিন্ন গ্রহের আনুমানিক পরিধি পরিমাপ করেছিলেন বরাহমিহির। সূ্র্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে বরাহমিহিরের গবেষণা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূ্র্ণ। মঙ্গলের পরিধি গণনার ক্ষেত্রে মাত্র ১১ শতাংশ ত্রুটি ছিল বরাহমিহিরের। পাশাপাশি তিনি বলেছিলেন, মঙ্গল গ্রহে পানি এবং লোহার অস্তিত্ব রয়েছে।

সম্প্রতি নাসার পাঠানো মঙ্গলযান কিউরিওসিটি মঙ্গল থেকে যেসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তা থেকে জানা যায়, বরাহমিহিরের দুটি সিদ্ধান্তই ছিল নির্ভুল।

বরাহমিহির বর্তমান মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে ৫০৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন শক জাতিভুক্ত। তখন আফগানিস্তান, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও রাজপুতানা (বর্তমান রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ) নিয়ে গঠিত এক বিরাট এলাকা জুড়ে শকস্তান নামের রাজ্য ছিল। শকরা ছিল মূলত পূর্ব ইরান থেকে আগত একটি গোত্র। মিহির নামটি ফার্সি ‘মিথ্‌রা’ শব্দ থেকে এসেছে। ভারতের প্রাচীন মথুরা রাজ্যের নামও এই ফার্সি শব্দটি থেকে এসেছে। তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, এনবিটি

পড়া হয়েছে ৩৭ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ