মার্কিন ‘জিহাদিরা’ বাইরের কেউ নয়

ডিসেম্বর ১৪, ২০১৭, ১২:২২ অপরাহ্ণ

র‌্যান্ড করপোরেশনের প্রতিবেদন

আমেরিকান ‘জিহাদিরা’ বাইরে থেকে আমদানি করা নয়। বরং তারা জিহাদি হয়ে উঠেছে আমেরিকান সমাজেই।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত প্রভাবশালী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যান্ড করপোরেশনের সাম্প্রতিক প্রকাশনা ‘দ্য ওরিজিন্স অব আমেরিকান জিহাদিস্টস’ (আমেরিকান জিহাদিদের উত্সস্থল) এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (৯/১১) যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে অর্থাত্ গত দেড় দশকের বেশি সময়ের মধ্যে ওই দেশটিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের প্রায় সবাই ওই দেশেরই নাগরিক।উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমা দেশ ইসলামের নামে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ‘জিহাদি তত্পরতা’ বলে অভিহিত করে থাকে। তবে ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এগুলো জিহাদ নয়। ইসলাম কখনো সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না।

র‌্যান্ড করপোরেশন তার প্রকাশনায় ৯/১১-এর পর থেকে ৮৬টি সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা ও ২২টি সংঘটিত হামলা বিশ্লেষণ করেছে। এই হামলাগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ছিল ১৭৮ জন। তাদের মধ্যে ৮৬ জন জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, ৪৬ জন আইনগত প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়েছে এবং ২৩ জন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা। বাকি ২৩ জনের মধ্যেও একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

তবে সে জন্মসূত্রে নাকি পরবর্তী সময়ে আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক তা র‌্যান্ড করপোরেশন নিশ্চিত হতে পারেনি। এর বাইরে আটজন যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী ভিসা নিয়ে গিয়েছিল। চারজনকে (তিনজন শৈশবে এবং একজন কৈশোরে) যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছিল। দুজন ছিল শরণার্থী। যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা পরিকল্পনায় (২০০৭ সালে) তিন বিদেশি সম্পৃক্ত ছিল। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকেনি। এর বাইরে বাকি পাঁচজনের বিষয়ে জানা যায়নি।র‌্যান্ড করপোরেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে হামলা পরিকল্পনা ও হামলাকারীদের বেশির ভাগের (৮৬ জন) জন্ম যুক্তরাষ্ট্রেই। ১৮টি হামলা ও হামলা পরিকল্পনাকারীদের জন্ম পাকিস্তানে। এর পরই আছে সোমালিয়া ও আফগানিস্তান (ছয়টি করে)। বাংলাদেশ, আলবেনিয়া, গায়ানা, জর্দান, মরক্কো ও সৌদি আরবে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি করে হামলা বা হামলা পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

প্রতিবেদনে অভিবাসী আমেরিকানদের জিহাদি তত্পরতার তালিকায় ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার ঘটনায় বাংলাদেশি কাজী নাফিস, গত বছর অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্যকে হত্যা পরিকল্পনার ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আইনগতভাবে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া নিলেশ দাস এবং যুক্তরাষ্ট্রে এক পাকিস্তানি কূটনীতিককে হত্যা পরিকল্পনার ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মোহাম্মদ এম হোসেনের নাম রয়েছে। ১৯৫৫ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রে যায় ১৯৮৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ বছর অবস্থানের পর তার বিরুদ্ধে ওই হত্যা পরিকল্পনা করার অভিযোগ ওঠে।

কাজী নাফিস ২১ বছর বয়সে ২০১২ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যায়। ওই বছরই তার বিরুদ্ধে ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগ ওঠে। কথিত ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তার সহচর হিসেবে ছিল এফবিআইর একজন আন্ডার কভার এজেন্ট। নিলেশ দাস মাত্র তিন বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে যায়। ২১ বছর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের পর তার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্যকে হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগ ওঠে।

গত সোমবার নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানের বোমা হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আকায়েদ উল্লাহ (২৭) অন্তত আট বছর আগে ‘এফ-৪১’ ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যান। অন্তত ২১ বছর বয়সী যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের ভাই বা বোনদের যুক্তরাষ্ট্র ‘এফ-৪১’ ভিসা দিয়ে থাকে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, একক কোনো সন্ত্রাসী প্রচারণায় কোনো আমেরিকান জিহাদি গ্রুপের উদ্ভব হয়নি। ৯/১১ হামলার পর থেকে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে এক কোটিরও বেশি বিদেশি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদি সন্ত্রাসী পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্ম এমন ব্যক্তির সংখ্যা মাত্র ৯১ জন। তাদের মধ্যে ৬৬ জনের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের তারিখ থেকে জানা যায় যে ১১ জন ৯/১১ হামলার পর ঢুকেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্মগ্রহণকারী ও যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদি হয়েছে এমন ব্যক্তিরা গেছে ৩৮টি দেশ থেকে। সংখ্যার হিসাবে এ তালিকার শীর্ষে আছে পাকিস্তান।

গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে যতই কড়াকড়ি আরোপ করা হোক না কেন তা ভবিষ্যতে সম্ভাব্য উগ্রবাদীদের চিহ্নিত করতে পারে না। বিদেশি জিহাদিদের বেশির ভাগই কম বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ওই ব্যক্তিদের গড় বয়স ছিল ১৫ বছরের কম। আর ওই ব্যক্তিরা গড়ে ২৭.৭ বছর বয়সে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করে বা চালায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, নিউ ইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে আটক আকায়েদ উল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ডধারী। গত সোমবার হামলার ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে তাঁর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম প্রচার হওয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাস  তাত্ক্ষণিকভাবে ওই হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অপরাধের বিচার দাবি করেছে।

অতীতে বিভিন্ন সময় বিদেশে উগ্রবাদে জড়ানো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অবস্থানের সময় তারা উগ্রবাদ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিল না। বিদেশে অবস্থানের সময় নানা ঘটনাপ্রবাহের প্রভাবে তাদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। তবে বাংলাদেশ উগ্রবাদ-সন্ত্রাসবাদ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না ও প্রশ্রয় দেয় না। বরং এ ধরনের অপরাধের আন্তর্দেশীয় তদন্তে বাংলাদেশ সহায়তা করে আসছে।

পড়া হয়েছে ১০৫ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ