শীতের অসুখবিসুখ

ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭, ১২:৪১ অপরাহ্ণ

শীতকালে বাতাসে ধুলাবালির পরিমাণ বাড়ে, জলীয়বাষ্পের আর্দ্রতা বা তাপমাত্রা কমে যায়। ফলে অ্যাজমা, ঠাণ্ডা-সর্দি-জ্বর ছাড়াও নানা অসুখ বাসা বাঁধে। এ সময়ের অসুখবিসুখে তাই সতর্ক থাকতে হয়। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

হাঁপানি যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে শীতে এর প্রকোপ বাড়ে

হাঁপানি বা অ্যাজমা

যেকোনো বয়সীদের হাঁপানি হতে পারে। তবে শীতকালে বয়স্ক মানুষরা অ্যাজমা বা হাঁপানির মতো রোগে ভোগে বেশি।

তাই অ্যাজমা রোগীদের ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করা উচিত। তাদের চলাফেরা, ওঠা-বসা, খাবারদাবার—এককথায় জীবনযাত্রার সব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। বাইরে বের হলে মাথা ও কান ঢেকে গরম কাপড় পরিধান করতে হবে। ধুলাবালি, পশুর লোম, ফুলের রেণুর সংস্পর্শ পরিহার করে হাতের কাছে প্রয়োজনীয় ইনহেলার ও অন্যান্য ওষুধ সব সময় সংগ্রহে রাখতে হবে।

ঠাণ্ডা-সর্দি-কাশি

ঠাণ্ডা লাগা, সর্দি-কাশি-ফ্লু শীতকালে সাধারণ এক সমস্যা, যা প্রায় প্রতি ঘরেই দেখা যায়। সাধারণ সর্দি-কাশি থেকেই নিউমোনিয়া হতে পারে যে কারো। তবে শিশু, শ্বাসতন্ত্রের অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তি, গর্ভবতী, ডায়াবেটিক রোগী এবং বেশি বয়স্ক মানুষ এতে বেশি আক্রান্ত হতে পারে। এসব প্রতিরোধে লেবুর রস, তুলসীপাতার রস, আদা চা, মধু, ভিটামিন ‘সি’ প্রচুর পরিমাণে খান। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে প্রতিদিন কয়েকবার দুই হাত ধোয়া, বাসার জিনিসপত্র সাবধানে স্পর্শ করা, নাক মোছার জন্য নরম ও পাতলা টিস্যু ব্যবহার করা উচিত।

 

টনসিলের সমস্যা

গলা ব্যথা, স্বরভঙ্গ, কণ্ঠনালির নানা সমস্যাসহ টনসিলের প্রদাহ বা টনসিলাইটিস শীতে বেশি হয়। সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণে টনসিলাইটিস বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে ওষুধ সেবনের খুব একটা দরকার পড়ে না।

এসব সমস্যা যাঁদের রয়েছে, তাঁরা লবণ মিশ্রিত হালকা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করলে আরাম পাবেন। ঠাণ্ডা পানি পরিহার করে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন ও গলায় গরম কাপড় বা মাফলার জড়িয়ে রাখুন। সেই সঙ্গে মাউথওয়াশ দিয়ে কুলি করলে ভালো থাকা যায়। জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল ও সর্দি-কাশি থাকলে অ্যান্টিহিস্টামিন সেবন করা উচিত।

 

শুষ্ক ত্বক

শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় ত্বক শুষ্ক হয়। যাদের পুরনো চর্মরোগ যেমন—সোরিয়াসিস, অ্যাকজিমা ইত্যাদি আছে, তাদের সমস্যা এই সময় বেড়ে যেতে পারে। চুলকানিসহ আরো কিছু রোগও এ সময় বাড়ে।

ত্বকের যত্নে তেল, লোশন, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে ত্বকের যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। গোসলে যথাসম্ভব সাবান কম ব্যবহার করা ভালো। পাশাপাশি সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, প্রচুর পানি পান করা, হালকা ব্যায়াম করা, ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার, সবুজ শাকসবজি, গাজর, মিষ্টি আলু, কুমড়া, মাছ প্রভৃতি বেশি খাওয়া উচিত।

 

হাত-পা ঠাণ্ডা

রক্ত চলাচল দেহকে উষ্ণতা দেয়। কিন্তু যাদের হাতে ও পায়ে সমস্যা রয়েছে, শীতের সময় তাদের সুষ্ঠুভাবে রক্ত চলাচল ব্যাহত হতে পারে। হাত-পা অস্বাভাবিক শীতল হয়ে ‘রেনডস’ ডিজিজও হতে পারে। তাদের অনেকের আবার হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই শীত বেশি থাকলে বা তাপমাত্রা কমতে থাকলে একটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।

 

ভিটামিন ‘ডি’র স্বল্পতা

শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ সংগ্রহের অন্যতম উৎস সূর্যরশ্মি, বিশেষ করে সকালের রোদ। কিন্তু শীতে সূর্যালোক কম থাকায় পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া যায় না। দেহে এই ভিটামিনের অভাবে নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই শীতে পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘ডি’প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত।

 

সাইনাস ইনফেকশন

সাইনোসাইটিস বা সাইনাসের ইনফেকশন বলতে সাধারণত নাকের পাশে হাড়ের ভেতর থাকা বায়ুকুঠুরিতে প্রদাহ বা সংক্রমণকে বোঝানো হয়। এ জন্য মাথা ব্যথা, নাকে ও কপালে ব্যথা অনুভব, জ্বর, নাক দিয়ে ঘন হলদেটে রস ঝরা, নাক বন্ধ ভাব, গলা ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। সাইনাস ইনফেকশন হলে চিকিৎসা করা উচিত। কারণ এ থেকে অস্টিওমায়োলাইটিস, ব্রেন অ্যাবসেস, সেলুলাইটিস, মেনিনজাইটিসের মতো মারাত্মক অসুখও হতে পারে।

 

সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার (স্যাড)

সূর্যের আলো কমে আসার ফলে স্যাডের (এসএডি) মতো সমস্যা দেখা দেয়। এটা অনেকটা মানসিক রোগের মতো। শীতকালে নানা উৎসবমুখর আয়োজন-অনুষ্ঠান থাকলেও মন থেকে বিষণ্ন ভাব কাটে না। ভর করে অবসাদ। শীতের সময়টায় ঘোলাটে মস্তিষ্ক, দৈহিক শক্তি কমে আসা এবং যেকোনো বিষয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো ঘটনা নতুন নয়। এতে ক্ষুধামন্দাও দেখা দেয়। কোনো কাজে মনোযোগ আসে না। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সময়গুলো অস্থির করে তোলে।

 

নরোভাইরাস

শীতে বমি বা ডায়রিয়ার প্রকোপকে বলে নরোভাইরাস। এর সংক্রমণ পাকস্থলীতে হানা দেয়। যদিও নরোভাইরাসের উৎপাত সারা বছরই থাকে, তবুও শীতের সময় বেশি হয়। বিশেষ করে মানুষজন বেশি থাকে এমন স্থানে নরোভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যায়। কম বয়সীদের এ রোগে বেশি পড়তে দেখা যায়। যদি বমি ও ডায়রিয়ার মতো অসুবিধা দেখা দেয়, তবে অতিরিক্ত তরল খেতে হবে।

 

বাত ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা

ফাইব্রোসাইটিস, মাইওসাইটিস, নিউরাইটিস, গাউট, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, স্পনডাইলোসিস—এই রোগগুলো সারা বছরই কষ্ট দেয়, কিন্তু শীতের সময় এর কষ্ট বাড়ে।

যাদের অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা হাড়ের রোগ রয়েছে, শীতকালে তাদের সমস্যা অনেক বেশি হয়। এসব নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা ধরনের ব্যায়াম, গরম ছেঁক ও ফিজিওথেরাপি নিলে ভালো হয়। চেষ্টা করা উচিত গরম কাপড় পরিধানের। কেননা শরীরে শীত যত কম লাগবে, বাতের যন্ত্রণা তত কম হবে।

 

হার্ট অ্যাটাক

ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় রক্তচাপ বেড়ে গেলে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এতে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ঘটতে পারে। এ জন্য শোবার ঘরের পরিবেশ যথাসম্ভব উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি গরম পানি পান, মোটা কাপড় পরিধান করা ভালো। বয়স্ক ও হৃদরোগীরা বিশেষ সকর্ত থাকবেন।

 

সাকিব সিকান্দার, কালের কন্ঠ

পড়া হয়েছে ২০২ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ