শেখ হাসিনার নোবেল পুরস্কারের কী দরকার?

ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭, ৩:৪৯ অপরাহ্ণ

আশীষ চক্রবর্ত্তীঃ  অং সান সু চি নোবেল পাওয়ায় বিশ্বমানবতার কি খুব কল্যাণ হয়েছে? নোবেল কি সব সময় যোগ্যতার ভিত্তিতেই দেয়া হয়? গত সাড়ে তিন মাসে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় শেখ হাসিনার তাহলে নোবেল পাওয়ার কী দরকার?

শেখ হাসিনার নোবেল প্রাপ্তির সম্ভাবনায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা বা না পাওয়ায় হতাশা কিংবা ‘তামাশা’ – সবই দু’মাস ধরে বন্ধ৷ আগামী বছর অক্টোবরে নোবেল পুরস্কার দেয়ার সময় এলে আবার হয়ত শুরু হবে৷ শুরু হবে রাজনীতি থেকে সংবাদ মাধ্যম পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এক শ্রেণির অত্যুৎসাহী চাটুকারের তৎপরতা৷ হাসিনার রাজনৈতিক এবং ‘অরাজনৈতিক’ বিরোধীরাও নিশ্চয়ই তখন আবার তৎপর হয়ে ওঠার সুযোগটা নেবেন৷ বুঝে এবং না বুঝে তোষামোদ অথবা বিরোধিতায় মেতে থাকা তো আজকাল ‘সংস্কৃতি’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কেন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতেই হবে, এটা আমিও ঠিক বুঝি না৷ নোবেল কি যোগ্য মানুষের উপযুক্ত স্বীকৃতির প্রতীক হয়ে উঠতে পেরেছে? হতে পারবে কোনোদিন? কী হবে শেখ হাসিনা নোবেল পেলে? হয়ত দেশে বিজয় মিছিল, বিজয়োৎসব ইত্যাদির নামে মানুষের ভোগান্তি কয়েকদিনের জন্য বাড়ানো হবে৷ হ্যাঁ, প্রত্যক্ষ প্রাপ্তি এইটুকুই হতে পারে৷ অনেকে পরোক্ষ একটা প্রাপ্তিকেও হয়ত অগ্রাহ্য করতে চাইবেন ন৷ তাঁরা বলবেন, ‘‘কেন, শেখ হাসিনা নোবেল পেলে নোবেলজয়ী বাঙালি তো একজন বাড়বে! প্রথম নারী নোবেল বিজয়ীও পাবে বাঙালি!” তা ঠিক৷ তবে রোহিঙ্গা সংকট ঘণীভূত হওয়ার পর্যায়ে পেলে সেই নোবেল অহংকার না হয়ে লজ্জাও হয়ে উঠতে পারে৷ অসময়ে পুরস্কৃত হওয়ার সর্বশেষ প্রকৃষ্ট উদাহরণ বারাক ওবামা৷ নোবেল পাওয়ার পর প্রাপ্তির কারণটা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেও খুব একটা বুঝতে পেরেছিলেন কিনা সে বিষয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে৷

১৯৪৩ সালে ভিয়েতনামের লি ডুক থো-ও খুব বিব্রত হয়েছিলেন৷ প্যারিস শান্তি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করা হলেও শান্তি আসেনি, তখনো যুদ্ধ চলছে পুরোদমে৷ তাই পুরস্কারটা নিতেই চাননি ডুক থো৷

নোবেল পুরস্কার বলতে গেলে প্রবর্তনের সময় থেকেই বিতর্কের আবর্তনে৷ যে কোনো মানদণ্ডে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পুরস্কার পাননি, এমন দৃষ্টান্ত অনেক৷ লিও টলস্টয়, রোজালিন্ড ফ্র্যাংকলিন, জোনাস সাক, মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে একালের স্টিফেন হকিং পর্যন্ত অসংখ্য নাম আসতে পারে সেই তালিকায়৷

সাহিত্যে টলস্টয় আর খর্খে লুইস বর্খেস এবং শান্তিতে মহাত্মা গান্ধীর মতো মানুষের নোবেল না পাওয়া তো নোবেল কমিটিকে চিরপ্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে৷ মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর নোবেলবঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি অনেক নোবেলজয়ীর বক্তব্যেই হাস্যকর হয়েছে বহুবার৷ বিশ্ব শান্তিতে ভূমিকা রেখেছেন এমন অনেক নন্দিত ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধীকে চিরকাল গুরুর মতো মেনেছেন, এখনো মানছেন৷ তাঁদের অনেকেই নোবেল পেয়েছেন৷ নেলসন ম্যান্ডেলা, দলাই লামা, আলবার্ট আইনস্টাইন, জর্জ বার্নাড শ, পার্ল এস ব্রুক, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাল-গোর, মিয়ানমারের তথাকথিত ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ অং সান সু চি….প্রত্যেকেই গান্ধীভক্ত এবং প্রত্যেকেই কিন্তু নোবেলজয়ী৷ তাঁরা বহুবার বলেছেন, জীবনদর্শন বা রাজনৈতিক দর্শনে তাঁদের ওপর যাঁর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, তিনি মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ লড়াইটা জিতে ম্যান্ডেলা স্বীকার করেছিলেন যে, গান্ধীর ব্রিটিশবিরোধী অহিংস আন্দোলন থেকে প্রেরণা না নিলে তাঁর পক্ষে বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হতো না৷

যুক্তরাষ্ট্রের এক স্কুল ছাত্র একবার বারাক ওবামাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘‘ধরুন, আপনাকে জীবিত বা মৃত কোনো একজন মানুষের সঙ্গে ডিনারের সুযোগ দেয়া হলো, ডিনারে কাকে চাইবেন আপনি?” একটুও দেরি না করে ওবামা বলেছিলেন, ‘‘গান্ধী, কারণ আমার চোখে তিনিই প্রকৃত হিরো৷”

‘কেউ এক গালে চড় দিলে তার দিকে আরেক গাল বাড়িয়ে দাও’ – এই নীতিতে আন্দোলন করে ব্রিটিশদের ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী৷ শান্তির এমন দূত সম্পর্কে নোবেলজয়ী আইরিশ লেখক জর্জ বার্নার্ড শ-র উক্তিটা আরো বেশি মনে রাখার মতো৷ বার্নার্ড শ যে গান্ধীভক্ত, তা জানা ছিল সবার৷ তো একবার ‘তাঁর জীবনে গান্ধীর প্রভাব কতটা’ – জানতে চাইলে সাহিত্যের নোবেলজয়ী বলেছিলেন, ‘‘মনে হচ্ছে, আপনি যেন জানতে চাইলেন একজন মানুষের মধ্যে হিমালয়ের ছাপ কতটা৷”

সেই গান্ধীকে শান্তি পুরস্কার দিতে পারেনি নোবেল কমিটি৷

সুতরাং নোবেল জয় করা মানেই আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া নয়, আবার না পাওয়া মানেও জীবনের সব অর্থহীন নয়৷

আশীষ চক্রবর্ত্তীআশীষ চক্রবর্ত্তী

২০১৫ সালের পর রব উঠেছিল, ম্যার্কেল শান্তি পুরস্কার পেতে পারেন৷ এখনো কিন্তু পাননি৷ তাতে কি বিশ্বের দরবারে জার্মান চ্যান্সেলরের মর্যাদা কিছু কমেছে?

আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ জার্মানির প্রায় অর্ধেক৷ অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যা জার্মানির প্রায় দ্বিগুন৷ দু’দেশের অর্থনীতির তো কোনো তুলনাই হয় না৷ এমন একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিন মাসে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার প্রাণ বাঁচানোর দায়িত্বনিয়ে রাষ্ট্রনেতা হিসেবে শেখ হাসিনা এমনিতেই নিজেকে প্রায় ম্যার্কেলের উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন৷ নোবেল না পেলে ম্যার্কেল বা হাসিনার কী আসে যায়!

বরং পুরস্কার পেয়ে কারো কারো মতো উপহাসের পাত্র না হয়ে, পুরস্কার না পাওয়া অনেক বেশি সম্মানের৷

চাটুকারদের মনে রাখা দরকার, শেখ হাসিনা ছয় লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন আর একাত্তরে এক কোটি বাঙালিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী৷ ইন্দিরা গান্ধী নোবেল পাননি৷ তাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো মানুষের কাছে কিন্তু তাঁর সম্মান এক রত্তিও কমেনি৷

আর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক এবং ‘অরাজনৈতিক’ বিরোধীদেরও মনে রাখা দরকার, কখনো কখনো নোবেল না পাওয়া নয়, বরং পাওয়াটাই তামাশার বিষয়৷ অং সান সু চি-র নোবেল জয়ের চেয়ে বড় তামাশা এ মুহূর্তে সারা পৃথিবীতেই তো দ্বিতীয়টি নেই!

পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পরও অনেকে শেখ হাসিনাকে সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী ভেবেছিলেন৷ শান্তি চুক্তি এখনো অনেকাংশে বাস্তবায়িত হয়নি৷ সত্যি সত্যিই তখন পেয়ে গেলে এতদিনে পুরস্কারটা হয়ত তামাশাই হয়ে যেত৷

শেখ হাসিনার নোবেল পুরস্কারের এখন অন্তত কোনো দরকারই নেই৷ আগে দরকার রোহিঙ্গা সংকটেরনিরসন৷ সংকট নিরসন হলে নোবেলেরই হয়ত শেখ হাসিনাকে দরকার হবে৷

ডয়চে ভেলে

পড়া হয়েছে ৬১ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ