কাঠের মোটরসাইকেল!

জানুয়ারি ৩, ২০১৮, ২:১৭ অপরাহ্ণ

নিজের উদ্ভাবিত কাঠের মোটরসাইকেলে হুমায়ুন কবির।

মাটির ঘরের দেয়ালের বিভিন্ন স্থান খসে পড়েছে। চালের জং ধরা টিনের এখানে-সেখানে ছিদ্র।

বৃষ্টিতে জোড়াতালি দিয়ে পানি আটকানো হয়। ঘরে আসবাবপত্র নেই বললেই চলে। সেখানে একটি পড়ার টেবিল পাওয়া কল্পনাবিলাস। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।এর মধ্যেই ব্যাটারিচালিত কাঠের মোটরসাইকেল উদ্ভাবন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তরুণ হুমায়ুন কবির। চারটি ব্যাটারি একবারের চার্জে মোটরসাইকেলটি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিবেগে ৩০ কিলোমিটার পথ চলতে পারে। কাঠ, লোহা আর প্লাই বোর্ড দিয়ে তৈরি এর অবকাঠামো আর-১ (আরওয়ান) বা অ্যাপাসি মোটরসাইকেলের মতো দেখতে।

হুমায়ুন কবির হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম সাহেবনগরের দরিদ্র নাসির উদ্দিন ও আফিয়া খাতুনের একমাত্র ছেলে। হুমায়ুনের জন্মের তিন মাস পর তাঁর মা-বাবার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়।

নাসির আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র সংসার পাতেন। আফিয়া আর বিয়ে না করে হুমায়ুনকে লালন-পালন ও পড়াশোনা করাতে থাকেন। তিনি চকোলেট ও শিশুদের খাবার নিয়ে একটি বিদ্যালয়ের সামনে দোকানদারি করেন। পাশাপাশি ঠেলাগাড়িতে ধাক্কা দেওয়ার কাজ করে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালান।হুমায়ুন ২০১৭ সালে হবিগঞ্জ কবির কলেজিয়েট একাডেমি থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। তিনি চৌমুহনী ইউনিয়নের ডা. জরিফ হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর কারিগরি প্রতিভার দিকে দৃষ্টি পড়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন অরুণের। তাঁর উৎসাহ ও সহযোগিতায় হুমায়ুন ছোটখাটো যান্ত্রিক খেলনা তৈরিতে সক্ষম হন। হবিগঞ্জ কলেজিয়েট একাডেমিতে অধ্যয়নকালে ২০১৫ সালে হুমায়ুন কাঠ দিয়ে ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল তৈরির কাজ শুরু করেন। দুই বছরের সাধনায় অবশেষে তিনি মোটরসাইকেলটি তৈরিতে সক্ষম হন। দীর্ঘ গবেষণায় তাঁর প্রায় ৪২ হাজার টাকা ব্যয় হয়। মোটরসাইকেলটি তৈরিতে টাকার জোগান এবং অসুস্থ মাকে চিকিৎসা করাতে লোকজনের বাড়িতে দিনভিত্তিক কাঠমিস্ত্রি ও রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন হুমায়ুন। মায়ের চিকিৎসা আর সংসার চালিয়ে উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে হুমায়ুন মোটরসাইকেলটি তৈরি করেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, কলেজের অধ্যক্ষ, তাঁর মামা ও আত্মীয়স্বজনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তাঁর স্বপ্ন সফল হয়।

ডা. জরিফ হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন অরুণ বলেন, ‘হুমায়ুন কাঠের মোটরসাইকেলটি আবিষ্কার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মোটরসাইকেলটির ডিজাইন হুমায়ুন নিজেই করেছেন। ’ হবিগঞ্জ কবির কলেজিয়েট একাডেমির অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন শাওন বলেন, ‘প্রতিভা থাকলে কাউকে দরিদ্রতা দমিয়ে রাখতে পারে না। এর প্রমাণ হুমায়ুন। তার প্রতিভা কাজে লাগাতে প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা এবং উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সে আরো দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারবে। ’ তিনি জানান, হুমায়ুন দরিদ্র হওয়ায় তার লেখাপড়া ও খাওয়ার খরচের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করেছেন। তার ভবিষ্যৎ লেখাপড়ার জন্য আরো সহযোগিতা দরকার।

আফিয়া খাতুন বলেন, ‘অতিকষ্টে ছেলে হুমায়ুনকে লেখাপড়া করাচ্ছি। সে সব সময় টুকটাক এটা সেটা বানানোর জন্য কাজ করত। প্রথমে বুঝতে পারিনি কী কাজ সে করছে। এখন দেখি সে মোটরসাইকেল বানাইছে! প্রথমে বিশ্বাস হয়নি এটি চলবে। আমার হুমায়ুন যখন মোটরসাইকেলটি চালিয়ে দেখায় তখন অনেক আনন্দ হয়েছে। ’

হুমায়ুন কবির সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা দেশি ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর ব্যাটারিচালিত কাঠের মোটরসাইকেল উৎপাদন করে দেশের মানুষের কল্যাণে স্বল্পমূল্যে বাজারজাত করতে আগ্রহী। তিনি জানান, সহযোগিতা পেলে তিনি মোটরসাইকেলের নতুন নতুন ডিজাইন তৈরি করে চমক লাগাতে পারবেন। তাঁর এই কাজে সহযোগিতার জন্য শিক্ষক ও অন্যদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

হুমায়ুন জানান, আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় ইচ্ছা থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য কোথাও ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেননি তিনি। এলাকার কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে টুকটাক কাজ করে তিনি মাকে দেখাশোনা করবেন।

হবিগঞ্জ শহরের বেবিস্ট্যান্ড এলাকার মোটর যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী সেলিম মিয়া জানান, তাঁর কাছ থেকে হুমায়ুন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনে নিয়েছেন। তবে কাঠ দিয়ে ও তেল ছাড়া মোটরসাইকেল কেউ তৈরি করতে পারবে তাঁর বিশ্বাস হয়নি। হুমায়ুন মোটরসাইকেল বানিয়ে প্রমাণ করেছেন, প্রচেষ্টা থাকলে অসম্ভব কিছু নেই।

হবিগঞ্জ পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মোতাহার হোসেন জানান, প্রত্যন্ত এলাকায় থেকে এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না পড়েই একটি ছেলে এ ধরনের উদ্ভাবন করেছে জেনে তিনি আনন্দিত। তাঁর প্রতিষ্ঠানে হুমায়ুন এলে তিনি সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

মাধবপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোকলেছুর রহমান জানান, কেউ এ ধরনের উদ্ভাবনী কাজ করলে তাকে অবশ্যই সহযোগিতা করা হবে। সরকার এ ধরনের উদ্ভাবনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

কালের কণ্ঠ

পড়া হয়েছে ১৯০ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ