এই রাত ডাকে এই চাঁদ ডাকে হায় তুমি কোথায়?

জানুয়ারি ১৭, ২০১৮, ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

ছোটবেলায় ভালো নাচতেন শাম্মী আক্তার। সেজন্য তিনি নৃত্যশিল্পী হতে চেয়েছিলেন। তার কখনো মনে হয়নি সংগীতশিল্পী হবেন, প্রতিষ্ঠা পাবেন। কিন্তু শাম্মী আক্তার ছোটবেলায় তার বাবা-চাচাদের একদিন গান শুনিয়েছিলেন। তখন শাম্মী আক্তারের চাচা তার বাবাকে (খোকন) জানিয়েছিলেন, তাকে গান শেখাতে। এরপর থেকে বাবার তাগিদে রোজ সকালে উঠে গানের অনুশীলন করতেন শাম্মী আক্তার।

ছয় বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেল ৪ টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন শাম্মী আক্তার। ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হওয়ার শুরুর দিকে এক সাক্ষাৎকারে শাম্মী আক্তার তার শৈশবের দিনগুলো ও কীভাবে গায়িকা হয়েছে সেই গল্প শুনিয়েছিলেন। শাম্মী আক্তার বলেছিলেন, তার জন্ম যশোরের তালতলা গ্রামে নানাবাড়িতে, কিন্তু তিনি বেড়ে উঠেছেন খুলনায়। সেখানেই তার বাবার বাড়ি।

তিনি জানিয়েছিলেন, ছোটবেলায় আমি ভীষণ দুষ্টু ছিলাম। নানাবাড়ি যশোর গেলে মাছ ধরতাম, গাছে উঠে আম-বরই পাড়তাম। খালামনিদের সঙ্গে টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়াতাম। আমার বড় দু-বোনের স্কুলে একবার অনুষ্ঠান হয়েছিল। তাদের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম। আমাকে বসিয়ে ওরা কই জানি চলে গিয়েছিল। আমি তখন বেঞ্চে বসে লাফালাফি করছিলাম। তখন বেঞ্চ থেকে পড়ে, লোহার পেরেকে শরীরে খুব আঘাত পেয়েছিলাম।

শাম্মী আক্তার বলেছিলেন, আমার বাবার জন্য আমি শিল্পী হতে পেরেছি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে টেনে তুলতেন, হারমোনিয়াম তানপুরা কাছে দিয়ে রেয়াজ করাতেন। আমি ফাঁকি দিলেই বাবা পাশের রুম থেকে এসে ধমক দিতেন। বাবা ভূমি অফিসে চাকরি করতেন। একটা সময় বাবা বরিশাল বদলী হয়ে যান। আমরাও খুলনা থেকে বরিশাল চলে যাই। ওখানেই গিয়েই আমার গানের মূল হাতেখড়ি, তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। আমার গানের ওস্তাদ ছিলেন গৌর বাবু, তাকে আমি কাকা বলে ডাকতাম।

একদিন কাকার কাছে গান শিখতে বসে ফাঁকি দিচ্ছিলাম। উনি আমাকে সন্ধ্যা মুখার্জির একটা গান গাইতে বলেছিলেন, আর হারমোনিয়াম কীভাবে বাজাতে হয় শেখাচ্ছিলেন । আমি বারবার অন্য মনস্ক হলে উনি আমাকে পেনসিল দিয়ে আঙ্গুলে আঘাত করেছিলেন। আমার তখন রাগ ওঠে, এরপর মনের মধ্যে জেদ কাজ করে। ওইদিন থেকেই মন দিয়ে গান করতে শুরু করি। প্রথম স্টেজ শো’র কথা উল্লেখ করে শাম্মী আক্তার বলেছিলেন, আমার আব্বা হাত ধরে স্টেজে উঠিয়ে দিয়েছিলনে। আমার পছন্দে স্টেজে প্রথম গান করি ‘চৈতি ফুলে কি বাঁধিস রাখা রাখী’।

এরপর ১৯৭০ সালের দিকে জীবনের প্রথম বেতারের গানে কণ্ঠ দেন শাম্মী আক্তার। গানটি ছিল নজরুলসংগীত এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়। তার প্লেব্যাকে অভিষেক হয় অশিক্ষিত (১৯৮০) ছবিতে। আর এই অভিষেক গানটিই ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। গানটি ছিল ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে। এরপর আমি যেমন আছি তেমন রব বউ হবো না রে, এই বাংলার মাটিতে শ্যামলে মাতে, ভালোবাসলেও সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না এমন অনেক জনপ্রিয় গানের শিল্পী শাম্মী আক্তার।

সংগীত জীবনে অসংখ্য পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ভালবাসলে ঘর বাঁধা যায় না ছবিতে গান গেয়ে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ গায়িকার সম্মান পেয়েছিলেন ২০১০ সালে।

প্রসঙ্গত, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন শাম্মী আক্তার। গেল বছর অক্টোবরে তার চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছিল। শেষরক্ষা হলো না কিছুতেই। মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। তার মৃত্যুতে সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ব্যক্তিজীবনে ১৯৭৭ সালের ২২ ফ্রেব্রুয়ারি আকরামুল ইসলামের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন শাম্মী আক্তার।

chaneli

পড়া হয়েছে ২২১ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ