ছিনতাইকারীর দখলে ভোরের ঢাকা

জানুয়ারি ২৭, ২০১৮, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ

ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে মর্মান্তিকভাবে নিহত মা হেলেনার লাশ গাড়িতে নিয়ে গ্রামের পথে সন্তানরা

রাস্তায় একা চলতে ভয় পেতেন হেলেনা বেগম (৪০)। সব সময় স্বামী মনিরুল ইসলাম মন্টুর হাত আঁকড়ে ধরে রাস্তা পেরোতেন আর বলতেন, কোন্ সময় গাড়ি এসে চাপা দেয়! গতকাল শুক্রবার ভোরেও রাজধানীর ধানমণ্ডিতে মিরপুর সড়ক পার হচ্ছিলেন হেলেনা। একদিকে ভোরের ক্ষীণ আলো, অন্যদিকে ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ির ভয়, তাই স্ত্রীর হাত ধরে তাঁকে রাস্তা পার করছিলেন মন্টু। তবে গাড়ি নয়, গাড়ির বেপরোয়া চালকই তাঁদের কাছে মৃত্যুদূত হিসেবে হাজির হলো। পেছন দিক থেকে আসা একটি প্রাইভেট কারের চালক জানালার কাচ নামিয়ে হেলেনার ব্যাগ ধরে হেঁচকা টান দেয়। এতে তাঁর হাত আটকে যায় সেই জানালায়। টান লেগে স্বামীর হাত থেকে সরে সেই প্রাইভেট কারের জানালায় ঝুলতে থাকেন হেলেনা। হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকারও করেন তিনি। এভাবে প্রায় ২০ গজ দূরে চলে যাওয়ার পর ছিটকে পড়েন রাস্তায়। এরপর সেই ‘ভয়ংকর গাড়ির’ পেছনের চাকার নিচে পড়ে থেঁতলে যায় হেলেনার মুখ। স্বামীর চোখের সামনে আধো আলোতে পড়ে থাকে প্রিয়তমা স্ত্রীর নিথর দেহ। আক্রান্ত হওয়ার পর সাহায্য চেয়ে চিৎকার করেছিলেন মন্টুও। তবে সাহায্য করার কেউ ছিল না সেখানে। পরে স্ত্রীর লাশ নিয়েও আর্তনাদ করেছেন কয়েক মিনিট। প্রায় ১০ মিনিট পর হাজির হয় পুলিশ।

গতকাল ভোরে স্বামীর সামনে এমন মর্মান্তিকভাবে মারা যাওয়া হেলেনা ছিলেন গ্রিনলাইফ হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাঁর স্বামী মন্টু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে বিলাপ করে কালের কণ্ঠ’র কাছে সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত ‘টানা পার্টির’ কবলে পড়ে গতকাল যখন হেলেনা নিহত হলেন, প্রায় একই সময় মোহাম্মদ ইব্রাহিম (৩৬) নামে 

খুলনার এক ব্যবসায়ী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন সায়েদাবাদ এলাকায়। স্বামীবাগ রেললাইনে দুর্বৃত্তরা তাঁকে ছুরিকাঘাত করে। ইব্রাহিমও সাহায্যের জন্য পাননি কাউকে। ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে নিজেই ছুটে যান হাসপাতালে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। একপর্যায়ে তিনি থেমে যান চিরদিনের জন্য। স্বজনদের দাবি, ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েই মর্মান্তিকভাবে মারা গেছেন ইব্রাহিম। এ ছাড়া ঢাকায় তাঁর কোনো শত্রু নেই। তবে পুলিশের দাবি, ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নয়, ভিন্ন কারণে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তাদের যুক্তি—ইব্রাহিমের কাছে লক্ষাধিক টাকা ও মোবাইল ফোন থাকলেও সেসব নেয়নি হত্যাকারীরা।

গতকাল সন্ধ্যায়ও হাজারীবাগে ছুরিকাহত হয়েছেন জাকির হোসেন নামে এক তরুণ। ওই সময় তাঁর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জাকিরের বাবা আবদুর রব জানান, তাঁরা কামরাঙ্গীরচরে থাকেন। ইলেকট্রিক সামগ্রী মেরামতের কাজ শিখছেন জাকির। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি রায়েরবাজার এলাকায় একজনের কাছ থেকে পাওনা ২০ হাজার টাকা নিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন। পথে হাজারীবাগের জয়নুল হক শিকদার উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পেছনে চার-পাঁচজন ছিনতাইকারী তাঁর পথরোধ করে। তারা জাকিরের কাঁধে ও পিঠে ছুরিকাঘাত করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।

গতকালের এই তিন ঘটনার মতো আগেও বেশ কয়েকটি ঘটনায় ছিনতাইকারী এবং ‘টানা পার্টি’ নিয়ে ব্যাপক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। আলোচিত দু-একটি ঘটনার আসামি ধরে পুলিশ দাবি করে আসছে, ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনকহারে হচ্ছে না। টানা পার্টিতে জড়িত মাদকাসক্তরা। এরা ধরাও পড়ছে। তবে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধান এবং ভুক্তভোগীদের বয়ানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। রাজধানীতে প্রতিদিনই টানা পার্টির টান দিয়ে ব্যাগ কেড়ে নেওয়া বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আর বেশির ভাগ ঘটনা ঘটছে ভোরে। কিছু ঘটনা ঘটে বিকেল থেকে মধ্যরাতে। ওই সময় শহরে পুলিশের নজরদারির ক্ষেত্রে ব্যাপক উদাসীনতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় নির্ধারিত চেকপোস্টেও পুলিশ সদস্যরা থাকেন না। কোথাও কোথাও টহলের দায়িত্বরত সদস্যরাও গাড়ি রেখে ঘুমিয়ে থাকেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগে এবং সরেজমিনে আলামত পাওয়ার পর গতকালের দুই ঘটনায়ও এর সত্যতা মিলেছে। ধানমণ্ডি, সায়েদাবাদসহ শহরের কয়েকটি এলাকায় নির্বিঘ্নে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ছিনতাইকারীচক্র। ধানমণ্ডি থেকে মিরপুর, রমনা, মালিবাগ পর্যন্ত সাদা প্রাইভেট কারে টানা পার্টির ছোবলে প্রাণহানির বেশ কিছু ঘটনা জানা গেছে।

দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করছেন। তাঁরা বলছেন, শহরে নিয়মিত নজরদারি আছে। এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তাঁরা।

নিহত হেলেনার স্বামী মনিরুল ইসলাম মন্টু জানান, তাঁর স্ত্রী গ্রিনলাইফ হাসপাতালের ‘আয়া’ ছিলেন। তিনি নিজে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টেকনেশিয়ান। তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে হেলেনার কর্মস্থলের কাছেই কলাবাগানে ১৬৮/২ নম্বর বাড়িতে থাকেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের দক্ষিণ কড়াপুর নবগ্রামে। জাতীয় পরিচয়ের স্মার্টকার্ড নিতে গত বুধবার স্বামী-স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। গতকাল তাঁরা লঞ্চে সদরঘাট নেমে সেখান থেকে ৭ নম্বর বাসে করে ধানমণ্ডির ৭ নম্বর রোডে মডার্ন হাসপাতাল ও ঢাকা ব্যাংকের কাছে নামেন ভোর ৫টায়। তখন বাইরে অনেকটা অন্ধকার। তাঁরা রাস্তা পার হয়ে রিকশায় বা হেঁটে বাসায় যাওয়ার চিন্তা করছিলেন।

মন্টু বিলাপ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, “ও রাস্তায় নামলে ভয় পায়। মোর আত ধরে থাকে। বলে, ‘গাড়ি এসে যদি চাপ দেয়!’ মুই হাত ধরে পার হচ্ছিলাম। আমার হাত থেকে যমের হাতে চইলা গেল…।” তিনি জানান, রাস্তার মাঝপথে আসার পর পেছন দিক থেকে সাদা রঙের একটি টয়োটা প্রাইভেট কার আসে। ওই গাড়িটি তাঁদের বাঁ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চালক কাচ নামিয়ে হেলেনার ব্যাগ ধরে টান দেয়। তখন হেলেনার হাতে দুটি ব্যাগ ছিল। হেলেনার হাত গাড়ির সেই জানালায় আটকে যায়। চিৎকার করেন তিনি। মন্টুও চিৎকার করেন। প্রায় ২০ গজ দূরে যাওয়ার পর হেলেনা পড়ে যান। তখন গাড়িটির পেছনের চাকা হেলেনার মাথার ওপর দিয়ে যায়। মন্টু দৌড়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে আবারও চিৎকার করেন। পাশের ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরাও সাহায্য করতে এগিয়ে যাননি। রাস্তায় কোনো পুলিশও দেখেননি মন্টু। হেলেনার মাথা থেঁতলে রাস্তায় প্রায় মিলে যায়। রক্তে ভিজে যায় রাস্তা। ওই অবস্থায়ই স্ত্রীকে নিয়ে রাস্তায় বসে বিলাপ করছিলেন মন্টু। কয়েক মিনিট পরে পুলিশের গাড়ি পৌঁছায়। এরপর আশপাশের লোকজন হাজির হয়। মন্টু জানান, ছিনতাইকারীর সেই সাদা গাড়িতে চালকের বাঁ পাশে আরেকজন বসা ছিল।

ধানমণ্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ এবং পরিদর্শক (তদন্ত) পারভেজ ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় পুলিশের টহল ছিল বলেও জানান তাঁরা। সেখান থেকেই পুলিশ যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই থানার বর্ডার এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে। এটা দুঃখজনক। আমরা তদন্ত শুরু করেছি। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষাসহ বিভিন্নভাবে তদন্ত করা হবে।’

ঘটনাস্থলের কাছে এক ভবনের নিরাপত্তাকর্মী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চিৎকার শুনে আমি এগিয়ে ঘটনা দেখেছি। তবে ভয়ে বের হইনি। এখানে প্রায়ই এমন ছিনতাই হয়। রাতে পুলিশ দুই-একবার গাড়ি নিয়ে ঘুরলেও ভোর ৪টার পরে ৭টা পর্যন্ত থাকে না। ৫টার দিকেই ছিনতাই বেশি হয়।’

ধানমণ্ডি এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ধানমণ্ডি ৩ নম্বর, ৫ নম্বর, ৮ নম্বর, ৮ নম্বর (লেকের সড়ক), ঝিগাতলা, ১৫ নম্বর, আবহানী মাঠ ও শঙ্কর এলাকায় সাদা গাড়ি ও মোটরসাইকেলে টানা পার্টি সক্রিয়। গত ২ জানুয়ারি রাতে সেন্ট্রাল রোডের মাথায় ল্যাবএইড হাসপাতালের গণসংযোগ শাখার ব্যবস্থাপক মেজবাহ য়াযাদের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয় একটি সাদা গাড়ি থেকে।

আব্দুর রহিম নামে নিউ মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি দুইবার শিকার হয়েছি। মাঝেমধ্যে ভোরে আসতে হয়। বাস থেকে নামতেই ভয় লাগে। তবে সাহায্য চাওয়ার মতো পুলিশ দেখিনি।’

গত বছরের ২৯ নভেম্বর মিরপুর সড়কের কলেজ রোড সিগন্যাল থেকে রিকশা নিয়ে মোহাম্মদপুর যাওয়ার সময় আক্রান্ত হন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট (এনআইসিভিডি) ও হাসপাতালের চিকিৎসক ফরহাদ আলম। কাছেই শাহজাহান রোডে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে তাঁর ব্যাগ নিয়ে যায়। এতে রাস্তায় ছিটকে পড়ে নিহত হন চিকিৎসক ফরহাদ।

২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর ভোরে ধানমণ্ডির সোবহানবাগে মিরপুর রোডেই টানা পার্টির কবলে পড়ে শিশুসন্তান রাইসার সামনে প্রাণ হারিয়েছিলেন মা রিপা।

মিরপুর, আদাবর, শেরে বাংলানগর, শ্যামলী ও আগারগাঁওয়ে প্রায় দিন ভোরেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই এলাকা থেকে তিন দফায় এক ডজন ছিনতাইকারী ধরেছে র‌্যাব। তবে শনাক্ত হয়নি চিকিৎসক ফরহাদের খুনি।

হাসপাতালে ছুটেও শেষ রক্ষা হয়নি ইব্রাহিমের : হাসপাতাল সূত্র ও বাহকের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে সায়েদাবাদ এলাকায় স্বামীবাগ রেললাইনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ব্যবসায়ী ইব্রাহিমকে ছুরিকাঘাত করা হয়। টিকাটুলীতে সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতালে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ছুটে যান তিনি। অবস্থা দেখে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করা হলেও চালক ইব্রাহিমকে নিতে চাননি। পরে ওয়ারী থানা পুলিশের গাড়িতে করে গতকাল ভোর ৪টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় তাঁকে। সাড়ে ৫টার দিকে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই সময় তাঁর পকেটে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়।

নিহত ইব্রাহিমের ভগ্নিপতি মোহাম্মদ হক কালের কণ্ঠকে জানান, ইব্রাহিম খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার শেখপাড়ার মৃত বজলুর রহমানের ছেলে। স্ত্রী রোকেয়া এবং পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আনাসকে নিয়ে শেখপাড়ায় থাকতেন। তিনি সোনাডাঙ্গা থানা ২০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওখানে তাঁর জাহাজের যন্ত্রাংশের ব্যবসা আছে। পণ্যসামগ্রী কিনতে প্রায়ই ঢাকা আসতেন ইব্রাহিম। গত মঙ্গলবার রাতে মালপত্র কিনতে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। ধোলাইখাল থেকে মালপত্র কেনার কথা ছিল।

ওয়ারী থানার এসআই শরিফুল ইসলাম বলেন, ইব্রাহিমকে আহত অবস্থায় জিজ্ঞেস করলে তিনি পুলিশকে জানান যে রেললাইনের পাশে কে বা কারা তাঁকে কুপিয়েছে। রক্তাক্ত অবস্থায় এক কিলোমিটারের বেশি পথ দৌড়ে সালাউদ্দিন হাসপাতালে যান তিনি। তাঁর পকেটে নারায়ণগঞ্জের বাসের টিকিট পাওয়া গেছে। সেখান থেকেই ঢাকায় ফেরেন তিনি। এরপরই এ ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশের ওয়ারী বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার সোহেল রানা বলেন, ‘ইব্রাহিম তিন দিন আগে ঢাকায় এসে একটি আবাসিক হোটেলে ছিল। ছিনতাইকারীরা এ ধরনের কাজ করলে ইব্রাহিমের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা ও মোবাইল সেট পাওয়া যেত না। সব বিষয় আমরা খতিয়ে দেখছি।’

জানা গেছে, ইব্রাহিম যেখানে আক্রান্ত হয়েছেন তার কাছাকাছি দয়াগঞ্জে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ভোরে এক রিকশা আরোহী দম্পতির ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় আরাফাত নামে তাঁদের ছয় মাস বয়সের শিশু ছিটকে রাস্তায় পড়ে মারা যায়। গত ৮ অক্টোবর ওয়ারীতেই ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র খন্দকার আবু তালহা ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন।

ওয়ারী বিভাগের ডিসি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ভোরে এলাকায় টহল থাকে। নজরদারি বাড়ানোর কারণে অনেক অপরাধী ধরা পড়েছে। ছিনতাইয়ের আলোচিত ঘটনাগুলোর আসামি সবই ধরা পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ভোরেই ভয়ংকর টানা পার্টি : অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের কলেজ গেট থেকে রিংরোড, কল্যাণপুর, গাবতলী থেকে মিরপুর ১, আগারগাঁও সংযোগ সড়ক, খিলক্ষেত থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়ক, কালশী রোড, মৌচাক মার্কেট থেকে মগবাজার, সদরঘাট থেকে সূত্রাপুর, সদরঘাট থেকে দয়াগঞ্জ, ওয়ারী, উত্তরা থেকে আব্দুল্লাহপুর, ঝিগাতলা থেকে রায়েরবাজার, ঝিগাতলা থেকে শংকর, মিরপুরের রূপনগর বেড়িবাঁধ, গুলিস্তান থেকে পল্টন, সার্ক ফোয়ারা থেকে রমনা পার্ক, কাঁটাবন থেকে নীলক্ষেত, পলাশী থেকে আজিমপুর এবং যাত্রাবাড়ীর দোলাইরপাড় থেকে শ্যামপুর এলাকায় টানা পার্টি বেশি সক্রিয়। এসবের মধ্যে রমনা, পল্টন, হাইকোর্ট মোড়, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর রোড, কাঁটাবন, এলিফ্যান্ট রোড ও মৌচাক এলাকায়ও সাদা গাড়ি নিয়ে টানা পার্টি সক্রিয়। ভুক্তভোগীরা বলছে, ভোরে রাস্তায় পুলিশের টহল থাকে না। নির্ধারিত চেকপোস্টেও থাকে না পুলিশ। কিছু এলাকায় রাতে ও ভোরে চেকপোস্ট থাকলেও সেখানে ট্রাফিক পুলিশের মতোই কেবল গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করা হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবাধে অপরাধ করছে ছিনতাইকারীরা।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ছিনতাইকারী বা টানা পার্টির শিকার হলে ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে অভিযোগ করে না পারতপক্ষে। হতাহতের ঘটনা না ঘটলে খবরও জানাজানি হয় না। এসব কারণেও ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর মিরপুরের সাংবাদিক কলোনির বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ৩ জানুয়ারি স্ত্রীকে নিয়ে কালশী রোডের কাজী ফুড আইল্যান্ডে খেতে গিয়েছিলাম। ওখানে নামার আগেই একটা সাদা গাড়ি এসে আমার স্ত্রীর ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়। আমি ধরে রেখেছিলাম বলে ও রাস্তায় পড়েনি। ওই রাস্তায় ভোরে আর সন্ধ্যার পর ঘটনাগুলো ঘটছে।’

গুলশানের একটি পাঁচতারা হোটেলের ইন্টার্ন শেফ জাহানাতুন জান্নাত জানান, গত ৩০ ডিসেম্বর কালশী সড়কে তাঁর ব্যাগও টেনে নেয় সাদা গাড়ি নিয়ে হাজির হওয়া টানা পার্টি। এর এক দিন পর এক সেনা সদস্য তাঁর পরিচয়পত্রসহ ব্যাগ পেয়ে কর্মস্থলে ফোন করে ফেরত দেন। ওই সেনা সদস্য জাহানাতুনকে জানান, বনানী ফ্লাইওভারের নিচে তিনি ব্যাগটি পেয়েছেন। সেখানে প্রায় দিন ভোরেই ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

নোয়াখালীর সোনামুরী থেকে গত ১১ জানুয়ারি ভোরে ঢাকার সায়েদাবাদে এসে পৌঁছান মৃদুল নামের এক যুবক। এরপর রিকশয় করে হাটখোলা রোডে বন্ধুর মেসে যাচ্ছিলেন। রাজধানী সুপার মার্কেটের কাছে মোটরসাইকেলে আসা টানা পার্টি তাঁর ব্যাগ ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। ওই সময় রাস্তায় কোনো পুলিশ দেখেননি বলে দাবি করেন মৃদুল।

জানা গেছে, গত বছর নভেম্বরে মতিঝিলে হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার সময় রিকশা থেকে পড়ে আহত হন এফবিসিসিআইয়ের এক নারী কর্মকর্তা।

২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট ভোরে কমলাপুরে চিকিৎসক দম্পতি সানজানা জেরিন খান ও মোনতাহিন আহসান ভুইয়া রনি একইভাবে পড়েছিলেন টানা পার্টির কবলে। মাথায় গুরুতর জখম নিয়ে কোমায় চলে যান ডাক্তার জেরিন। এখনো তিনি কোমায়।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই টানা পার্টির কথা শোনা যায়। তবে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছে না।’

শেরেবাংলানগর থানার ওসি গোপাল গণেশ বিশ্বাস বলেন, বাইরে থেকে এসে ঘটনা ঘটিয়ে অপরাধীরা চলে যায়। এলাকায় নজরদারি আছে।

মগবাজারে ছিনতাই রুখে দিল জনতা : গত বৃহস্পতিবার মগবাজারে ঘটেছে এক নাটকীয় ঘটনা। সকালে ডিবি পরিচয়ধারী চার ব্যক্তি টেনেহিঁচড়ে একজনকে মাইক্রোবাসে তুলে ছিনতাই করার চেষ্টা করলে পথচারীরা তাদের ধাওয়া করে। অপরাধীরা পালিয়ে গেলেও রক্ষা পেয়েছেন ভুক্তভোগী। পুলিশ জানায়, ব্যাংক থেকে প্রায় সাত লাখ টাকা তুলে বাইরে এলে সেই ব্যক্তিকে জোর করে মাইক্রোবাসে ওঠায় ছিনতাইকারীরা। সে সময় তাদের হাতে হ্যান্ডকাফ ও ওয়াকিটকি ছিল। তারা নিজেদের ‘ডিবি পুলিশ’ বলে পরিচয় দেয়। তারা  হ্যান্ডকাফ, ওয়াকিটকি ও ঢাকা মেট্রো চ-১৩৯৫৫১ মাইক্রোবাসটি ফেলে যায়।

ডিএমপির রমনা বিভাগের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আমরা বিআরটিএ থেকে মাইক্রোবাসটির মালিক সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

পড়া হয়েছে ১১৫ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ