বাংলা বেঁধেছে বিশ্বকে এক সুরে

ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮, ৮:১৬ অপরাহ্ণ

‘ওয়েপুল নোকি, ওয়েপুল হিয়াপসি’—এক ভাষা, এক আত্মা! যদি বলা হয়, বাংলাও এখন সেই ভাষার নাম, যে এক সুরে বেঁধেছে বিশ্বকে, খুব বেশি কি বলা হবে? বাংলাদেশ-ভারতসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে আজ বাংলাভাষীরা যখন গাইবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’, অন্য ভাষাভাষীরা নিজেদের মতো শপথ নেবে মায়ের ভাষার সুরক্ষার। নিজের ভাষা থেকে পাঠ, মাতৃভাষায় লেখা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বর্ণ প্রতিযোগিতা, এককথায় নানা আয়োজনে আজ মেতে উঠবে ছোট-বড় বিভিন্ন ভাষার সম্প্রদায়। এমনকি যে পাকিস্তান কালাকানুনে, বন্দুকের নলে বাংলা ভাষাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল, তারাও পালন করছে দিবসটি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে ভাষা উৎসবে মিলিত হন দেশটির বিভিন্ন ভাষাভাষী লেখকরা।

আজ ঘোষণা করা হবে লিঙ্গুয়াপ্যাক্স পুরস্কারও। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষিত হওয়ার পর পর ২০০২ সাল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে স্পেন থেকে।

দিবসটি ঘিরে জাতিসংঘে আজ রয়েছে বইমেলা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও গল্পশ্রবণ আসর। বিভিন্ন ভাষায় গল্প শোনার আসরটিকে বলা হচ্ছে ‘লাঞ্চ ইন টুয়েলভ ল্যাঙ্গুয়েজেস’, যা আজ বসবে সুইজারল্যান্ডে জেনেভা কার্যালয়ে। বইমেলার আয়োজনটি বসেছে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। মেলায় বিক্রি হবে জাতিসংঘ কর্মীদের দান করা বিভিন্ন ভাষায় লেখা বই। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পরই থাকবে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান। জাতিসংঘ তার কর্মীদের ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টার মধ্যে বই জমাদান করতে বলে। আজ স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ভিজিটরস লবিতে বসছে বইমেলা। জাতিসংঘ স্টাফ ও প্রতিনিধিদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত থাকছে মেলা। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর থাকবে সাংস্কৃতিক ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান।

জেনেভা দপ্তরে রয়েছে ‘মাদার টাং : রিভিজিটিং দি ইনকা ল্যাঙ্গুয়েজ’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীরও বিশেষ আয়োজন। বিষয় : টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে কিভাবে ভাষার বিকাশ ও সংরক্ষণ করা যায়।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ ভবনের রাসেল স্কয়ারে আজ রয়েছে মাতৃভাষা দিবস ঘিরে বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা অনুষ্ঠান। ‘কালারস অফ দি অ্যালফাবেট’ (২০১৬, জাম্বিয়া/যুক্তরাজ্য/নিউজিল্যান্ড; পরিচালক আলাস্তাইর কোলে)। মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি। এর মূল চরিত্রে তিন জাম্বিয়ান শিশু ও তাদের পরিবার। স্টিওয়ার্ড, এলিজাবেথ ও মোবারক জাম্বিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে ভর্তি হয়ে দেখে, তাদের মাতৃভাষায় কিছুই শেখানো হয় না এবং তারা একসময় আবিষ্কার করে তাদের মায়ের ভাষাটি আর তাদের নেই। আফ্রিকার ২৭ ভাষায় সাবটাইটেল করা হয়েছে চলচ্চিত্রটির।

স্পেনের বার্সেলোনার লিঙ্গুয়াপ্যাক্স ইনস্টিটিউট ২০০২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা পুরস্কার ঘোষণা করে থাকে। গত বছর পুরস্কার পেয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মাতহিয়াস ব্রেনজিঙ্গার। দক্ষিণ এশিয়ার একজনই এ পর্যন্ত লিঙ্গুয়াপ্যাক্স পদক পেয়েছেন, ভারতের জি এন ডেভি (২০১১ সাল)।

নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয়বারের মতো দিবসটি উদ্‌যাপন করছে; শিরোনাম : ‘(আন) স্পোকেন : এ সেলিব্রেশন অব ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ ডে’। বক্তাদের মধ্যে আছেন অধ্যাপক ক্যারল ব্যাসন, মেক্কি এলবারদি, সামিরা উদ্দিন, হুয়ান কার্লোস রেয়েস। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রতিবেশী হারলেম সম্প্রদায় সাংস্কৃতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক পরিবেশনায় অংশ নেবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ্বের নানা প্রান্তে ঝুঁকিতে থাকা ভাষাগুলোর সম্প্রদায়ের সামনে লড়াইয়ের নতুন মন্ত্র নিয়ে হাজির হচ্ছে। এমনই একটি জনগোষ্ঠী যুুক্তরাষ্ট্রের পাসকুয়া উপজাতি। দিবসটি সামনে রেখে তারা যে পোস্টার করেছে তা দৃষ্টিনন্দনই শুধু নয়, ভাষায়ও সমৃদ্ধ। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ কথাটি তাদের ইয়াকুই ভাষায় অনূদিত হয়েছে, হিয়াক নোকি টায়েওয়াই ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮।’ পোস্টারের মূল ছবির বাঁয়ে ইয়াকুই ভাষায় লেখা ‘ওয়েপুল নোকি, ওয়েপুল হিয়াপসি’। ডানে এর ইংরেজি অনুবাদ : ওয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ, ওয়ান হার্ট। ইয়াকুই ভাষায় স্লোগান লিখে অনুবাদ করা হয়েছে, দ্য ভয়েসেস অব আওয়ার বিলাভড এলডারস স্টিল লিভস অন।

হল্যান্ডের মাস্ট্রিখ বিশ্ববিদ্যালয় ‘টেক পার্ট ইন দি ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে ২০১৮’ শিরোনামে শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানিয়েছে ‘গ্রুটস অপ মিয়েন মুজেরটাওল’ কথাটিকে নিজ নিজ ভাষায় অনুবাদ করতে। মাস্ট্রিখ থেকে অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘গর্বিত আমি মাতৃভাষার জন্য’।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ‘মেয়রস অফিস অব ইমিগ্রেশন অ্যাফেয়ার্স’ নগরীর সব ভাষার জনগোষ্ঠীকে সামনে রেখে সানিসাইড কমিউনিটি সার্ভিসেস মিলনায়তনে আয়োজন করেছে বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার। মেক্সিকোয় দিবসটির আয়োজন উপলক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে মনোলোভা পোস্টার। দিবসটির শিরোনাম লাতিন ভাষায় লেখা হয়েছে এভাবে, দিয়া ইন্টারনেসিওনাল দে লা লেঙ্গুয়া মাতেরনা ২১ ডে ফেবরেরু।

ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার নগরীতে এখন সাজ সাজ রব। ইউনেসকোর লিটারেচার নগরী ঘোষিত হওয়ায় এবার নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণায় বলা হয়, মাতৃভাষা দিবসে আফ্রিকান সাহিত্যিক মাকুববি এবং জাপানি কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মারিকো নাগাইয়ের সৃষ্টিকর্ম তুলে ধরা হবে। ‘এজ পার্ট অব আওয়ার ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে সেলিব্রেশনস উই আর ডিলাইটেড টু ওয়েলকাম উগান্ডান নভেলিস্ট অ্যান্ড শর্ট স্টোরি রাইটার জেনিফার মাকুমবি’। দুটি অনুষ্ঠানই দর্শনীর বিনিময়ে দেখতে হবে।

‘ইউনেসকো সিটি অব লিটারেচার ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’ কর্মসূচির আওতায় ম্যানচেস্টারে আজ আরো আছে ‘রিফিউজি টেলস’ গ্রন্থ থেকে পাঠ। অনুষ্ঠালস্থল রকডালস পাইওনিয়ার জাদুঘর।

পাকিস্তানে দিবসটি পালন উপলক্ষে ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করা হয় ‘পাকিস্তান মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লিটারেচার ফেস্টিভাল’। আজ দেশটির অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। মাতৃভাষা দিবস আরো ব্যাপকভাবে পালনের আহ্বান জানানো হচ্ছে পাকিস্তানের বিভিন্ন মহল থেকেও। দৈনিক শাকতি করাচি পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ইব্রাহিম সালেহ মোহাম্মাদ গতকাল ফেসবুকে লেখেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১ ফেব্রুয়ারি এখন এক মহান দিবস হয়ে উঠেছে। মানুষ বেদিতে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।’

তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশে লেখেন, ‘ইটজ আ টাইম টু সেলিব্রেট বাংলাদেশ’স কালচার অ্যান্ড দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ।’ অর্থাৎ সময় এসেছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষাকে সাধুবাদ জানানোর!

kalerkontho

পড়া হয়েছে ১৩৫ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ