‘নিজের জন্য রাজনীতি করে কী লাভ?’

মার্চ ২, ২০১৮, ১১:৩৯ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতার আগে, পরে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন শাজাহান সিরাজ। জেলা, শহর, রাজধানী চষে দলকে সংগঠিত করেছেন। স্বাধীনতার ইশতেহার পড়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছেন। তাঁর বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনের খাতা খুলে দিলেন ৫০ বছরের সহযোদ্ধা ও স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ। জেনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন এ কে এম মহসীন

রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি কিভাবে?

১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিপক্ষে আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তাঁর জন্মস্থান টাঙ্গাইল মহকুমায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িয়ে পড়েন। টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান ফারুক তখন আওয়ামী ছাত্রলীগ করতেন। তিনি দেখলেন, ছেলেটি চৌকস, কবিতা লেখে, দেয়াল পত্রিকায় লেখে, কোরআন তেলাওয়াত, আবৃত্তি ইত্যাদি নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তিনি তাঁকে রাজনৈতিকভাবে খুব সহযোগিতা করতে লাগলেন। তবে শাজাহান সিরাজ ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ভালো ফুটবল খেলতেন। তখনকার দিনেই ৫-১০ টাকায় হায়ারে খেলতে যেতেন। মা মরা এই মানুষটি নানির হাতে মানুষ। না বলে একবার খেলতে যাওয়ায় ফেরার পর বাবা অ্যাডভোকেট আবদুল গনি মিঞার কঠিন শাসনের কারণে এর পর থেকে তাঁর খেলাই বন্ধ হয়ে গেল। পরে এ নিয়ে তিনি খুব দুঃখ করেছেন, ‘নিমাই আর আমি একসঙ্গে খেলেছি। সে হয়ে গেল মোহনবাগানের নামকরা খেলোয়াড়। আমি রাজনীতিবিদ!’ খেলা ছাড়ার পর রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। ষাটের দশকের সেই উত্তাল সময়ে সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল করতে করতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী ছাত্রলীগের সঙ্গে পুরোপুরি জড়ালেন।

 

লাইমলাইটে কিভাবে এলেন?

ধীরে ধীরে তিনি ছাত্রলীগের টাঙ্গাইল মহকুমার সভাপতি হলেন। করটিয়া সা’দত কলেজের ভিপি হওয়ার পর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা, ঢাকার জয়দেবপুরসহ আশপাশের এলাকার ছাত্র-ছাত্রীরা তখন এই কলেজে পড়তেন। তখনকার সময়ে সা’দত কলেজে অধ্যক্ষের পরই ভিপির অবস্থান ছিল। তাঁর প্রভাব ছিল প্রচণ্ড। কলেজটির ভিপি-জিএসরাই পুরো টাঙ্গাইলের যেকোনো সমস্যার সমাধান করতেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে পুরো অঞ্চলে তিনি মিটিং, মিছিল, সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছেন। একদিন ময়মনসিংহে মিটিং করছেন, গভর্নর মোনায়েম খান সেখানে ছিলেন। সা’দত কলেজের ভিপির আগমন তাঁর কানে তোলা হলো এবং বলা হলো, ভিপি এমন ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন, যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। ফলে সরকারের এনএসএফের গুণ্ডারা তাঁকে আক্রমণ করল। পরে সিনেমার বিখ্যাত অভিনেতা ওয়াসিমের নেতৃত্বে তাঁকে এমন মারধর করা হলো যে তিনি নিজের রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, তিনি মারা গেছেন। ফলে তাঁরা তাঁকে ফেলে রেখে গেলেন। পরে এ নিয়ে পাল্টা মারামারিও হয়েছে। আশপাশের বাড়ির দারোয়ান, মানুষজন এসে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করলেন। হাসপাতাল থেকে মামলা মাথায় নিয়ে আত্মগোপন করে ঢাকায় চলে এলেন।

 

এখানে তো মূলধারার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়ে গেল?

ঢাকায় এসে তিনি আত্মীয়ের বাড়ি উঠলেন। জীবন চালানোর জন্য আত্মীয়ের সাহায্যে ওয়াসায় ছোটখাটো কাজ নিলেন। আগে থেকেই ফারুক ভাইয়ের মাধ্যমে সিরাজুল আলম খান দাদার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তিনি তাঁকে কিছু দায়িত্ব দিয়ে বুঝলেন, মানুষটি খুব কাজের। তবে ঢাকায় এসে তাঁর মনে হলো, সাগর থেকে এসে খালে পড়েছেন। এখানে তো তিনি কেউ না। রাজধানীতেই ছাত্রলীগের অবস্থা বেহাল। মহকুমা শহরে ছাত্রলীগের দোর্দণ্ড প্রতাপ তৈরি করা এই নেতার দলটির এই অবস্থা দেখে খুব খারাপ লাগত। তিনি প্রচার সম্পাদক হিসেবে দলকে গোছানো, সদস্য সংগ্রহের প্রচারকার্য শুরু করলেন। ১৯৬২ সালে দাদা, কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রাজ্জাকরা মিলে ‘নিউক্লিয়াস’-এর জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি নিউক্লিয়াসের সদস্য হলেন। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাঁরা একটি স্বাধীন দেশের জন্য ঢাকার বিভিন্ন কলেজ, নানা জেলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচার শুরু করলেন। তখনো কিন্তু নিউক্লিয়াস আত্মপ্রকাশ করেনি। ১৯৬৯ সালে তিনি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন। আমি তখন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে আওয়ামী ছাত্রলীগের জিএস (সাধারণ সম্পাদক)। আন্দোলন করতে করতে আমাদের সম্পর্ক গাঢ় হলো। সেই তুঙ্গস্পর্শী আন্দোলনের বছরের অনেক স্মরণীয় স্মৃতি আছে। ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র মতিউরের কথা প্রায়ই বলেন। পুলিশের গুলিতে নিহত এই ছাত্রের লাশ নিয়ে তাঁরা ফিরেছিলেন। লাশটি দেখে তাঁর মনে হয়েছে—একেবারে জীবন্ত, নিষ্পাপ এক মুখ। এখনো বারবার সে চেহারা তাঁর চোখে ভাসে। আরেকটি ঘটনার কথা বলেন—আসাদ ভাই ঢাকার চানখাঁরপুলে মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। বিরাট মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে চানখাঁরপুল পর্যন্ত গিয়েছিল। তিনিও মিছিলে ছিলেন। সেদিনই আসাদ ভাই শহীদ হলেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা চলার সময় সার্জেন্ট জহুরুল হককে ক্যান্টনমেন্টে গুলি করে হত্যা করা হলো। বায়তুল মোকাররমে তাঁদের সভা চলছিল, হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-শ্রমিক-জনতা বর্ধমান হাউসের দিকে ছুটতে লাগল। এটি ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতির বাসভবন। বিক্ষুব্ধ জনতা মামলার সব নথি পুড়িয়ে দিল। মাঝপথে ইকবাল হলের নামফলক নামিয়ে ঘোষণা করা হলো, ‘আজ থেকে এই হলের নাম সার্জেন্ট জহুরুল হকের নামে হবে।’ তাঁরা পরে বর্ধমান হাউসে আগুন লাগিয়ে দিলেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি বিক্ষুদ্ধ মানুষ পরিবাগে খাজা সাহাব উদ্দিন, খাজা খায়ের উদ্দিন ও হাসান আসকারির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। ১৯৬৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মধুর ক্যান্টিনে প্রতিবাদসভা হয়। আমরাও কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে মধু ভাই, বদিউল আলম, চিশতি শাহ হেলালুর রহমান (১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইকবাল হলে হানাদারদের আক্রমণে শহীদ)ও ছিলেন। তাঁদের কারো মুখ থেকে প্রকাশ্যে জোরে প্রথম ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উঠল। আমরা সবাই সে স্লোগান দিলাম। জেল থেকে বেরোনোর পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব দেওয়া হলো। সেই মিটিংয়েও তিনি মঞ্চে ছিলেন। তখন তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। সব আন্দোলন, সংগ্রামেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

 

জেলা শহরের একটি ছেলে রাজধানীতে অল্পদিনের মধ্যে কিভাবে জায়গা করে নিলেন?

বরাবরই দেখেছি যে কোনো আন্দোলন, সংগঠন শক্তিশালী করার জন্য ১০ জনের একজন হিসেবে তিনিই সবচেয়ে ভালো কাজ করতেন। তাঁর মানুষকে কনভিনস করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। এই পরিবারের কেউ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিল না; কিন্তু পরিশ্রম, সততা, কথা ও কাজের মিলের কারণে তিনি এত বড় নেতা হতে পেরেছেন।

তিনি তো তখন শ্রমিক রাজনীতিও করেছেন?

১৯৬৯ সালে এ দেশে শ্রমিক রাজনীতি সংগঠিত হয়। শ্রমিক লীগও তৈরি হয়। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিল, ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে শ্রমিক লীগ করবেন। তিনি বলেনও, ‘তাঁদের জন্যই তো রাজনীতি করি। তাঁদের মুক্তি না এলে, নিজের জন্য রাজনীতি করে কী লাভ?’ সারা জীবন তাই তিনি সাধারণ মানুষ ও দেশের ভালোর জন্য রাজনীতি করেছেন। দাদা, রুহুল আমিন ভূঁইয়া, স্বপন কুমার চৌধুরী, শাজাহান সিরাজ, মোহাম্মদ শাজাহান—এই জাঁদরেল শ্রমিক নেতারা তখন শ্রমিক আন্দোলন করেছেন। শাজাহান ভাই পরে আইএলওর (ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন) সদস্য হয়েছেন। পোস্তগোলায় রুহুল আমিন ভূঁইয়া, তেজগাঁওতে শাজাহান ভাই, আদমজীতে সাদু ভাই শ্রমিক আন্দোলন ও শ্রমিকদের সংগঠিত করেছেন। তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়েছেন। তেজগাঁও, টঙ্গীতে ঘুরে ঘুরে মিটিং করতেন। শ্রমিকরা গমের সঙ্গে লবণ, মরিচ মিশিয়ে খেতেন। তিনিও সেই গমের ভাত খেতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের সংগঠিত করতেন। ছাত্র আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকতে পারতেন না বলে রাতে শ্রমিকদের ছোট্ট ঘরই তাঁর ঠিকানা ছিল।

 

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা কিভাবে তৈরি হলো?

বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাওয়ার পর আমাদের নিয়ে ‘জয় বাংলা বাহিনী’ তৈরি করা হলো। এটির আরেক নাম ‘১৫ ফেব্রুয়ারি বাহিনী’। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেছে বেছে ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে শোভাযাত্রা করিয়ে সার্জেন্ট জহুরুল হকের কবরে গিয়ে তাঁকে স্যালুট করার জন্য এই বাহিনীর জন্ম। ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ আমাদের শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিলেন। ১৯৬৯ সালের ৭ জুন পল্টন ময়দানে এই বাহিনীর কুচকাওয়াজ হলো। সার্জেন্ট জহুরুল হক দিবসে উত্তোলনের জন্য তাঁরা জাতীয় পতাকাটি তৈরি করেছিলেন। নীলচে রঙের সেই পতাকা নিয়ে আমরা শোভাযাত্রা করেছি। সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে ১৯৬৯ সালে বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট) গঠিত হয়। এটি নিউক্লিয়াসেরই গোপন কোষ। এটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্রলীগের মাধ্যমে সেটি বাস্তবায়ন করা হতো। ‘পদ্মা, মেঘনা, যমুনা; তোমার আমার ঠিকানা’; ‘স্বাধীন কর, স্বাধীন কর; বাংলাদেশ স্বাধীন কর’—এমন নতুন নতুন স্লোগান তখন আসতে লাগল। ইকবাল হলেই তিনি, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রবরা থাকতেন। দাদাও একটি রুমে থাকতেন। এটি আর এস এম হল তখন ছাত্রলীগের যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল। ইকবাল হলের ১০৬ নম্বর রুমে বসে যেহেতু আগের পতাকাটির রং পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার মতো ছিল, তাই নতুন জাতীয় পতাকা তৈরির জন্য ভাবনা শুরু করলেন। সভায় দাদা, কাজী আরেফ, মার্শাল মনি (মনিরুল ইসলাম), শাজাহান সিরাজ ছিলেন। দাদা বললেন, ‘পতাকা তৈরি করলেই পাকিস্তানিরা আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী, ভারতের সঙ্গে যোগ দিতে চাই’—এমন অভিযোগ করবে। ফলে যেটিই তৈরি করো, সেটির মধ্যে কোন ভূখণ্ডের জন্য আমরা সংগ্রাম করছি, সেটি বোঝাতে সেই মানচিত্রে সোনালি কিছু দিতে হবে।’ তবে তিনি বিরোধিতা করলেন, ‘কেন পতাকার মধ্যে এটি দিতে হবে?’ দাদা, কাজী আরেফ তাঁকে বোঝালেন, ‘সিরাজ ঠিকই বলেছ; কিন্তু দুই বাংলা যে আমরা এক করতে চাই না, সেটি বোঝানোর জন্য এই অংশটুকু প্রয়োজন।’ তিনি মেনে নিলেন। সেটির রং নিয়ে আলোচনা হলো। কেউ কেউ সবুজের কথা বললে তিনি বিরোধিতা করলেন। কারণ পাকিস্তানের পতাকার রং সবুজ। বললেন, ‘এ তো পাকিস্তানি মার্কা।’ মনি ভাই বললেন, ‘তাহলে গাঢ় সবুজ হোক।’ আলোচনার পর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে সদ্যোমুক্ত  বঙ্গবন্ধুকে স্যালুট দেওয়ার জন্য তাঁরা তড়িঘড়ি পতাকা তৈরির কাজ শুরু করলেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য স্বপন কুমার চৌধুরী বললেন, ‘কুমিল্লার ছাত্রলীগের নেতা শিবুকে (শিব নারায়ণ দাস) এস এম হলে দেখেছি।’ সুমন মাহমুদের রুম থেকে তাঁকে ১০৬ নম্বরে নিয়ে আসা হলো। মেঝেতে তাঁকে পতাকা এঁকে দেখানো হলো। কারফিউর মধ্যেই কমরেড রফিক বেরিয়ে এক বন্ধুকে ডেকে নিউ মার্কেটে তাঁর বাবার বন্ধ দোকান খুলিয়ে কাপড় নিয়ে এলেন। নিউক্লিয়াসের আরেক সদস্য খসরু (পরে নায়ক) নিউ মার্কেট থেকে রং, তুলি আনলেন। ছাত্রলীগের অফিসের পাশের পাক ফ্যাশনে সেটি সেলাই করা হলো। এখনো তিনি বলেন, ‘পতাকা তৈরি শেষে বেরিয়ে দেখি, পুব আকাশে লাল সূর্য উঠছে।’ এই পতাকা নিয়েই সালে পল্টন ময়দানে আমরা বঙ্গবন্ধুকে মার্চপাস্ট করে স্যালুট দিলাম। সেটিই তাঁকে দেওয়া প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মাননা, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন। ১৯৬৯ সালের ৬ জুনের সেই সভায় আমি প্রথম ‘জয় বাংলা’ ব্যানার দেখেছি।

 

স্বাধীনতার ইশতেহার কিভাবে পাঠ করলেন?

১৯৭০-৭১ মেয়াদে তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর আগে সত্তরের ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের পর বিভিন্ন স্থান থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন। ১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন আইনের ছাত্র শাজাহান সিরাজ তখন ডাকসুর জিএস আর নূরে আলম সিদ্দিকী ভিপি। তিনি, সিদ্দিকী ভাই, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখনকে নিয়ে এই কমিটি গড়ে উঠল। পরদিন তাঁরা বটতলায় মিটিং করলেন। সেখান থেকে আগামীকাল পল্টনে সংগ্রাম পরিষদের মিটিংয়ের ঘোষণা দিলেন। তখন পল্টনে এত উঁচু ভবন ছিল না। ঢাকা স্টেডিয়ামের খেলা বন্ধ হয়ে গেল, দর্শকরা মিটিংয়ে চলে এলেন। গাছ, ভবনের ছাদ লোকে ঠাসা। সকাল থেকে দলে দলে লোক আসতে লাগল। নূরে আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সভা শুরু হলো। শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করলেন—‘আজ থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করা হলো। সোনার বাংলা হবে এর জাতীয় সংগীত। শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বাধিনায়ক হবেন।’ নিউক্লিয়াসের লেখা ইশতেহারটি মঞ্চে পড়ার সময়ই সমাবেশে উপস্থিত আমাদের মধ্যে হাতে হাতে বিলি করা হয়েছে। নিউজপ্রিন্টে ছাপা ইশতেহারের ওপর লেখা ছিল ‘বুলেটিন-১’। পরে বিভিন্ন বইয়েও রেফারেন্স আকারে ছাপা হয়েছে। লাখো মানুষের করতালিতে তিনি ইশতেহার পাঠ করলেন। এরপর বঙ্গবন্ধু মঞ্চে এলেন। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি আর অনুপস্থিতিতে পড়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বুঝে তিনি তাঁর সামনে আবার পড়লেন। বঙ্গবন্ধু সেদিনের ভাষণে অসহযোগের ঘোষণা দিলেন। বললেন, ‘আজ থেকে আমরা আর খাজনা দেব না। সাতই মার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করব।’ সেদিনও তিনি মঞ্চে ছিলেন।

 

তখনকার কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা?

২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ ছিল। কেন্দ্রীয় কমান্ড, মানে নিউক্লিয়াস থেকে নির্দেশ এলো, আজ থেকে একে পাকিস্তান দিবস নয়, ‘বাংলাদেশ দিবস’ হিসেবে পালন করব। কোনো জায়গায়ই পাকিস্তানের পতাকা ওড়াতে দেব না। বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর জন্য ছাত্রদের নিয়ে তাঁরা প্রচুর ছোট পতাকা তৈরি করলেন। ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ রাতে যে যেভাবে পারলেন পতাকাগুলো ওড়ালেন। শাজাহান সিরাজ ও আ স ম আবদুর রব দায়িত্ব পেয়ে গভীর রাতে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকীর বাড়িতে গেলেন। সেখানে টিমটিমে একটি বাতি জ্বলছে। কলিংবেলে চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গেট খুলে দেওয়া হলো। তাঁরা তো অবাক! প্রধান বিচারপতি বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার কাছেও পতাকা আছে। সেটি উড়িয়ে দিয়ে ঘুমাতে যাব।’

 

২৫ মার্চ তিনি কোথায় ছিলেন?

পহেলা মার্চ থেকেই তো বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে থাকতেন। সেদিন মিটফোর্ডে তাঁর এক ডাক্তার আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। পুরনো আমলের ছয়তলা সেই ভবনের ছাদ থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে পুরো শহরে জ্বলে ওঠা আগুনের আলো দেখলেন। সকাল থেকেই মিলিটারিরা মিটফোর্ডের মাঠে স্তূপ করে লাশ ফেলতে লাগল। ভোরে সেই আত্মীয় তাঁকে লাশকাটা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। মিটফোর্ড কলেজ ছাত্র সংসদের বেয়ারা বারেকের সাহায্যে পরে তিনি জিঞ্জিরা চলে গেলেন। এরপর সেখানেও আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। পরে বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী মহিউদ্দিনের ভগ্নিপতি, ডাকনাম ‘গগন’, তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন, তাঁর বাড়ি কলাতিয়ার দিকে যাত্রা করলেন। মা, ছোট্ট কন্যাসন্তান ও ছোট ভাইকে নিয়ে সেখানে গিয়েও আমি তাঁকে পেলাম না। বারবার তিনি অবস্থান বদল করছিলেন। যেখানেই যাই, শুনি একটু আগে চলে গেছেন। তিনি নৌকায় ফরিদপুর গেলেন। কে এম ওবায়দুর রহমানের সাহায্যে রেলে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা হয়ে ভারতের নদীয়ায় গেলেন।

 

মুক্তিযোদ্ধার জীবন?

ভারতের বেলেঘাটায় তাঁদের অফিস ও থাকার জায়গা হলো। তিনি মুজিবনগর সরকারের শপথপাঠ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরাই তাঁকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। মেহেরপুরের আমবাগানের গাছের ডালে ডালে বাংলাদেশের পতাকা আর ভারতীয় সেনাদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়। কেউ কেউ ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ এই গানটিতে জাতীয় সঙ্গীত করার প্রস্তাব দিলেও আলোচনার ভিত্তিতে ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলার কথা আছে বলে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচিত হলো। অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ পত্র নিয়ে তিনি বিভিন্ন ক্যাম্প ঘুরে সমস্যাদি জানতেন, বক্তৃতা করতেন, তরুণদের মুক্তিফৌজে রিক্রুট করতেন। প্রধানত ছাত্রলীগের ছেলেদেরই তিনি রিক্রুট করে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতেন। পাঙ্গা ক্যাম্পেই বেশি কাজ করেছেন। মে থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি দলে ২০০ থেকে ৩০০ তরুণকে তিনি বাছাই করে প্রশিক্ষণে পাঠাতেন। পরে তাঁদের দেশের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধ করতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো।

 

জাসদের জন্ম হলো কিভাবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর নির্বাচনে ছাত্রলীগের ভাগাভাগি হলো। তিনি তখন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। নূরে আলম সিদ্দিকী-আবদুল কুদ্দুস মাখন একদিকে আর আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজ অন্য গ্রুপে ছিলেন। তাঁরা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন আর মাখন ভাইয়েরা ‘মুজিববাদ’। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি এই বিষয়ে ক্লাসও করতেন। পার্টির স্টাডি সার্কেলেও ক্লাস হতো। তাঁরা ছাত্রলীগের আলাদা সম্মেলন করলেন। তবে পল্টনে তাঁদের সেই মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধু গেলেন না। অন্যটিতে গেলেন। তাঁরা পাঁচ দিন টানা সম্মেলন করলেন। শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে সভাপতি নির্বাচিত করে এর পরই তো ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদের জন্ম হলো। ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল সভাপতি হিসেবে যোগ দিলেন। রব ভাই মহাসচিব নির্বাচিত হলেন। তিনি যুগ্ম সভাপতি নির্বাচিত হলেন।

 

জাসদের রাজনীতি?

তাঁরা নানা জায়গায় সভা করতে শুরু করলেন। আমার বাসায়ও জাসদের অনেক মিটিং হয়েছে। সারা দিন মিটিং করে রাত ১২টা-১টার দিকে বাসায় আসতেন। গোসল সেরে খেতে বসেছেন, তখনই হয় টেলিফোন বা মোটরসাইকেল এসে হাজির। এখনই যেতে হবে। তিনি একটু পরেই রওনা দিতেন। যেকোনো সময় তিনি মারা গেছেন—এই খবর শুনতে হবে বলে আতঙ্কে থাকতাম। বেশির ভাগ সময় সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে থাকতেন। সেখানে তাঁর আলাদা রুম ছিল। এরপর ১৯৭৩ সালের নির্বাচন এলো। সারা দেশে জাসদ প্রার্থী দিল। তিনি ঢাকার মিরপুর, রমনাসহ সারা দেশে পাঁচটি আসনে দাঁড়ালেন। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জিতলেও ঢাকায় এসে শুনলেন আরেকজন জিতে গেছেন। তখন তাঁর জীবন খুবই ঝুঁকির মধ্যে গেছে। নির্বাচনে তাঁরা পাঁচটি আসন পেলেন। নির্বাচনের পর আবার সংগঠনের কাজ শুরু করলেন। ১৯৭৩ সালের ১৭ মার্চ পল্টনের জনসভা শেষে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর কাছে পদযাত্রার মাধ্যমে স্মারকলিপি দিতে গিয়ে কোনো হঠকারিতা ছিল কি না আজও জানি না—গুলিবর্ষণ করা হলো। জলিল সাহেব, রব ভাই, মমতাজ বেগমসহ আরো অনেকে গুলিবিদ্ধ হলেন। রব ভাই, জলিল সাহেব গ্রেপ্তার হলেন। তবে তিনি সেদিন রমনা হয়ে সটকে পড়তে পারলেন বলে বেঁচে গেলেন। পরে তিনি তাঁদের দেখতে ঢাকা জেলে গেলেন। ফিরে এসে গাড়িতে ওঠার সময় গ্রেপ্তার হলেন। সেদিন রাত ২টার সময় আবার তাঁকে বাড়িতে এনে ফেরত দেওয়া হলো। তখন হাতিরপুলে ব্রাইটন হাসপাতালের কাছে থাকি। ফলে তিনি ভাবলেন, আর গ্রেপ্তার হবেন না। জাঁকিয়ে পার্টি করা শুরু করলেন। কিন্তু ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জিপিওর পার্টি অফিস থেকে তাঁকে ও নূরে আলম সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হলো।

 

তাঁকে ছাড়ালেন কিভাবে?

তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সঙ্গে দেখা করে পাস জোগাড় করলাম। তৎকালীন ঢাকা জেলা প্রশাসক একসময় ছাত্রলীগ করতেন, তাঁর কাছ থেকেও মাসে দুবার দেখা করার জন্য ছয় মাসের পাস জোগাড় করলাম। তখন আমি আর নূরে আলম সিদ্দিকী ভাইয়ের স্ত্রী তাঁদের দেখতে যেতাম। সারা দেশের নেতাকর্মীদের মামলা দেখাশোনার পাশাপাশি তাঁদের মামলাও দেখতে হতো। মুন্সীগঞ্জের লোক, আমাদের দলেরই উকিল কামরুজ্জামান ঢাকা কোর্টে আমাদের মামলা লড়া শুরু করলেন। শাজাহান সিরাজের বিপক্ষে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলা ছিল। ঢাকা কোর্টের মহিউদ্দিনসহ আরো কয়েকজনের পরামর্শে মামলা হাইকোর্টে নিলাম। এরপর নূরে আলম সিদ্দিকীর পরামর্শে তাঁর চিঠি নিয়ে হাইকোর্টের আইনজীবী শাহ আজিজুর রহমানের সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁদের দুজনের বাড়িই কুষ্টিয়ায়। এরপর আমাদের টাঙ্গাইলের ড. আলীম আল রাজীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকেও এই মামলা লড়ার জন্য রাজি করালাম। বিভিন্ন নথি জোগাড়ের জন্য খরচ করা বাদে আইনজীবীদের কোনো ফি দিতে হয়নি। তবে তাঁদের পেছনে দিনের পর দিন লেগে থাকতে হয়েছে। ছাত্রলীগের সাবেক বন্ধু, সিনিয়র-জুনিয়ররাও মামলায় তাঁর পাশে ছিলেন। তবে তাঁর মামলায় রায়ের পর হাজার হাজার নেতাকর্মী এর আলোকে জামিন পেলেন। এখনো আইনের বইতে এটি পড়ানো হয়। তিনি ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের আগে ছাড়া পেলেন। নির্বাচনে কালিহাতী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। জাসদ ১০টি আসন পেল।

 

এরশাদের আমলে তো আবার জাসদ ভাগ হলো?

এরশাদের আমলেও তিনি রাজনীতি করেছেন, মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের আগে হাসানুল হক ইনু একটি গ্রুপ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘আমরা নির্বাচনে যাব না।’ শাজাহান সিরাজ নির্বাচনে গেলেন। ফলে জাসদ ভাগ হয়ে গেল। রব ভাই রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। শাজাহান সিরাজরা ১৫ দল গড়ে তুললেন। তবে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেলেন না বলে জোটের প্রার্থী হয়েও তিনি হেরে গেলেন। তখন অনেক উত্তেজনা হয়েছে। এক রাতে চারবারও আমার বাসায় রেইড হয়েছে। সেবার শাজাহান খান (বর্তমানে নৌমন্ত্রী) আমাদের গ্রুপ থেকে বেরিয়ে মাদারীপুরে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করলেন। তার পর থেকে তিনি এই দল করছেন। ১৯৮৮ সালে তিনি এমপি হলেন। ১৯৯১ সালেও তিনি তাঁর কালিহাতী থেকে নির্বাচিত হলেন। ১৯৯৪ সালের নভেম্বর কি ডিসেম্বরে বিএনপিতে যোগ দিলেন। এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘দলটি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছে, বড় দলের সঙ্গে না থাকলে টিকে থাকা কঠিন।’

 

তিনি তো নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন?

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে যোগ দিয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী হলেন। ১৯৯৫ সালের শেষ অবধি এই পদে ছিলেন। তখন চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক আন্দোলন চলছিল। শ্রমিকদের পক্ষে সেটির মীমাংসা করলেন। বন্দরের উন্নয়ন করেছেন। আরিচার শ্রমিক আন্দোলনও তাঁর সমঝোতায় নিষ্পত্তি হলো। খুলনার খালিশপুরে শ্রমিকদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য স্কুল, মাঠ তৈরি করেছেন, শ্রমিকদের বেতন বাড়িয়েছেন। এরপর বিএনপি বিরোধী দলে ছিল। তখন তিনি দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিভিন্ন কর্মসূচি, রোডমার্চ ইত্যাদি সফল করার জন্য অনেক অবদান রেখেছেন বলে এখনো নেতাকর্মীরা বলেন। তখন আমি বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। মৌচাকে এক কর্মসূচিতে তিনি পুলিশের মারের আঘাতে এত আহত হলেন যে মাথায় রক্ত জমে গেল। বাঁ পাশে শক্তি পান না। সেই থেকে তাঁর অসুস্থতা বাড়ছে।

 

পরেরবার মন্ত্রী হয়ে পলিথিন উচ্ছেদ করেছেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেড় বছর ছিলেন। এ দেশ থেকে তিনি পলিথিন উচ্ছেদ করেছেন। পাটের ব্যাগ ব্যবহার চালু করেছেন। এর পর থেকে সোনালি আঁশের উৎপাদন বেড়েছে। বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়েছে। পাটের দামও বেড়েছে। এখনো এই ফসলের দাম বাড়তি। গাড়ির কালো ধোঁয়া উদিগরণ ঠেকাতে তিনি সিএনজি গ্যাস ব্যবহার চালু করলেন। ইটভাটা পরিবেশসম্মত করলেন। প্রতিটি কারখানায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরি করার বাধ্যবাধকতা চালু করলেন। তারপর তাঁকে সরিয়ে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো। তাঁকে ‘আধুনিক কালিহাতি’র রূপকার বলা হয়। যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তিনি এই এলাকার উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করেছেন।

 

তাঁর শরীর এখন কেমন?

২০১২ সাল থেকে তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছেন। দুই বছর পর ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হন। সারা জীবন দেশের জন্য কাজ করা এই মানুষটির জন্য আমি সবার কাছে দোয়া চাই—তিনি যেন সুস্থ থাকেন।

শ্রুতলিখন : সাইদ হাসান রাজ ও হারুন-অর-রশীদ কালের কন্ঠ 

(১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, গুলশান-১, ঢাকা)

পড়া হয়েছে ১৬০ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ