বাটোয়ারা দলিল: কেন করবেন, কিভাবে করবেন

অক্টোবর ২৭, ২০১৫, ৪:৫১ অপরাহ্ণ

ধরুন, বাবা-মার মৃত্যুর পর আপনারা ভাই-বোনেরা নিজেদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে চান। সাধারণত আমাদের দেশে এ রকম ক্ষেত্রে মৌখিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা করেই অংশীদাররা সম্পত্তি ভোগ করে থাকেন। কিন্তু এর ফলে ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাটোয়ারা দলিল সম্পাদনের মধ্য দিয়ে এই জটিলতা কমিয়ে আনা যায়। বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন আবরার মাসুদ

১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প আইনের ২(১৫) ধারায় বণ্টন দলিল সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বণ্টন দলিল’ অর্থ এমন কোনো দলিল যার মাধ্যমে কোনো সম্পত্তির সহ-মালিকগণ কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তি ব্যক্তিগত মালিকানায় পৃথকভাবে ভাগ করে নেয় বা নিতে সম্মত হয়। উল্লেখ্য, বণ্টন কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোনো রাজস্ব কর্তৃপক্ষ অথবা কোনো দেওয়ানি আদালত প্রদত্ত কোনো চূড়ান্ত আদেশ এবং কোনো সালিশকারী কর্তৃক প্রদত্ত বণ্টন-নির্দেশ রোয়েদাদও ‘বণ্টক দলিল’-এর অন্তর্ভুক্ত।
বাটোয়ারা দলিল কখন?

যৌথ পরিবারে ক্রয় করা সম্পত্তি ভোগদখলের সুবিধার্থে দখল অনুযায়ী বণ্টন করা যেতে পারে। আবার একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক একাধিক দলিল দ্বারা ক্রয়সূত্রে অর্জিত অবিভক্ত সম্পত্তি অথবা অন্য যে কোনোভাবে অর্জিত সম্পত্তি বণ্টন দলিলের মাধ্যমে বণ্টন করা যাবে। যৌথ মালিকানায় কেনা সম্পত্তিও ভোগদখলের সুবিধার্থে যে কোনো সময় আপস-বণ্টন করা যায়।
যৌথ সম্পত্তির পক্ষ যতজন থাকবেন, সম্পত্তি তত ভাগ করার পর প্রত্যেক পক্ষ আলাদা আলাদাভাবে সম্পত্তি বাটোয়ারা বা বণ্টন করে নিতে পারবেন। আবার যৌথভাবে ভোগদখলরত অবস্থায় সম্পত্তির মালিকদের মধ্যে যে কোনো একজন মালিক ইচ্ছা করলে তার নিজের সম্পত্তিটুকু বণ্টন করে নিতে পারেন। অন্যপক্ষরা একসঙ্গে ভোগদখল করার ইচ্ছা করলে যিনি বণ্টনক্রমে আলাদা হতে চান, তার ভাগ বাদ দিয়ে অপরাপর অংশীদাররা যৌথভাবে সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারবেন। লিখিত চুক্তি বা বণ্টন দলিল ছাড়াও আদালত এবং সালিশি রোয়েদাদের মাধ্যমেও বাটোয়ারা কাজ নিষ্পন্ন হতে পারে।
বাটোয়ারা দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক
উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জিত সম্পত্তির বাটোয়ারা দলিল রেজিস্ট্রেশন করা এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০০৪ সালে ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১) ধারা সংশোধন করে এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
স্ট্যাম্প ফি
দলিল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়। এর আগ পর্যন্ত উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জিত সম্পত্তির বাটোয়ারা দলিল রেজিস্ট্রেশন পক্ষদের ইচ্ছাধীন ছিল। বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সরকার এই দলিলের ফি এবং স্ট্যাম্প শুল্ক নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইতোপূর্বে বণ্টননামা দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি কবলা দলিলের সমপরিমাণ ছিল। এত উচ্চহারের ফি এবং স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ করতে হয় বলে বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রেশনের পক্ষগণ তা নিবন্ধন করতে চাইত না।
১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প আইনের তফসিল-১ এর ৪৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বণ্টননামা দলিলে স্ট্যাম্প যুক্ত করতে হয়। ওই অনুচ্ছেদ মোতাবেক বণ্টননামা দলিলের স্ট্যাম্প শুল্ক মূল্য নির্বিশেষে বর্তমানে মাত্র বিশ টাকা। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সালের ১৪২ আদেশ অনুযায়ী বণ্টননামার সঙ্গে হলফনামাও সংযুক্ত করতে হয়। হলফনামার স্ট্যাম্প শুল্ক বর্তমানে পঞ্চাশ টাকা এবং শপথনামার রেজিস্ট্রেশন ফি বর্তমানে ১০০ টাকা। এছাড়া কোনো দলিলের পৃষ্ঠা বেশি হলে বর্ধিত প্রতি পাতা পঁচিশ টাকা হারে ফিস বাড়তে পারে।
নিবন্ধন ফি
বণ্টননামা বা বাটোয়ারা দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি নিম্নরূপ_ (ক) সম্পত্তির মূল্য অনূর্ধ্ব তিন লাখ টাকা হলে- ফি ৫০০ টাকা। (খ) সম্পত্তির মূল্য তিন লাখ টাকার বেশি কিন্তু দশ লাখ টাকার কম হলে- ৭০০ টাকা। (গ) সম্পত্তির মূল্য দশ লাখ টাকার বেশি কিন্তু ত্রিশ লাখ টাকার কম হলে_ ১২০০ টাকা। (ঘ) সম্পত্তির মূল্য ত্রিশ লাখ টাকার বেশি কিন্তু পঞ্চাশ লাখ টাকার কম হলে_ ১৮০০ টাকা। (ঙ) সম্পত্তির মূল্য পঞ্চাশ লাখ টাকার বেশি হলে_ ফি গুনতে হবে ২০০০ টাকা।
বণ্টনের পর অংশীদারদের কর্তব্য
বণ্টননামা অনুযায়ী সম্পত্তির প্রাপ্ত অংশের টাইটেলসংক্রান্ত কাগজপত্র সংশ্লিষ্টপক্ষ নিজের কাছে সযত্নে রাখবেন। যদি প্রত্যেক পক্ষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দলিল না থাকে তবে ফটোকপি সংরক্ষণ করতে হবে। যে পক্ষের কাছে মূল দলিল থাকবে তিনি অপর পক্ষের প্রয়োজনে তা সরবরাহ করবেন। এই বিষয়গুলো সম্পর্কেও বণ্টননামা দলিলে লিখিত বিধান থাকা উচিত।
বণ্টননামায় উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো
যৌথ সম্পত্তির পক্ষবৃন্দ টাইটেল অর্থাৎ কিভাবে সম্পত্তি পেলেন সে সম্পর্কে বাটোয়ারা দলিলে রিসাইটেল বা বর্ণনা থাকা উচিত। সম্পত্তি বণ্টন করার ইচ্ছা এবং পক্ষদের অংশ, অবিভক্ত সম্পত্তি কিভাবে বিভক্ত করা হলো ইত্যাদির বিস্তারিত বর্ণনা থাকতে হবে।
বণ্টননামা দলিলের মূলকপি কার কাছে থাকবে সেটি দলিলে উল্লেখ করতে হয়। দলিলে যত পক্ষ থাকেন, ঠিক ততগুলো প্রতিলিপি নিবন্ধন করে নেয়া যায়। এই প্রতিলিপির স্ট্যাম্প বাবদ ২৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে খরচ পড়বে পঞ্চাশ টাকা থেকে একশত টাকা মাত্র। প্রতিলিপি দলিল দিয়ে প্রত্যেক পক্ষ মূল দলিলের মতোই কাজ করতে পারেন। কখনো কখনো পক্ষদের মধ্যে বণ্টনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোনো পক্ষকে নগদ টাকা প্রদান করতে হয়। এই টাকা প্রদানের বিষয়টি দলিলে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা উচিত। উল্লেখ্য, এরকম নগদ লেনদেনের জন্য বণ্টননামা দলিলে আলাদা ফি বা স্ট্যাম্প দিতে হয় না।
সব পক্ষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য
বণ্টননামার সব পক্ষকেই দলিলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়। কোনো পক্ষ নাবালক থাকলে তার পক্ষে যথাযথ অভিভাবক পক্ষ হিসেবে কাজ করতে পারেন। তবে নাবালক সাবালকত্ব অর্জন করার পর অভিভাবকের সিদ্ধান্ত না মানতে চাইলে আদালতে মামলা করতে পারেন। অংশীদারদের মধ্যে সমঝোতা না হলে সালিশ আদালতের মধ্যদিয়ে তার নিষ্পত্তি করতে হয়। আদালতে এ জন্য যে মামলা করতে হয়, সেটি ‘বাটোয়ারা মামলা’ নামে পরিচিত।

jjdin

পড়া হয়েছে ১৯৫৪ বার

( বি:দ্রঃ আপনভূবন ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত আপনভূবন ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ