গুম-গুপ্তহত্যা বাংলাদেশকে আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে--মোঃ গালিব মেহেদী খাঁন এর ব্লগ--আপন ভূবন ব্লগ - আপন প্রতিভার সন্ধানে 



প্রথম পাতা » মোঃ গালিব মেহেদী খাঁন এর ব্লগ » গুম-গুপ্তহত্যা বাংলাদেশকে আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে

গুম-গুপ্তহত্যা বাংলাদেশকে আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন : মোঃ গালিব মেহেদী খাঁন       ০৬ জানুয়ারী ২০১৮ রাত ৮:০৩


০টি মন্তব্য   ১৫৮ বার পড়া হয়েছে



মৃত্যু এক অমোঘ বিধান। যা অনিবার্য তা মেনে নেয়াই উত্তম। এখানে দুঃখ থাকে, বেদনা থাকে। থাকে হাহাকার। যা থাকে না তা হল অভিযোগ। স্বাভাবিক মৃত্যু তারা স্বজনদের শোকাতুর করে; কাউকে অভিযুক্ত করে না। অস্বাভাবিক মৃত্যু স্বজনদের শোকের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ করে, দায়ীকে অভিযুক্ত করে। অভিযুক্তের বিচার চায়, বিচার পেলে আত্মতুষ্টি লাভ করে। এক সময় মৃত স্বজনের শোক ভুলে স্বাভাবিক জীবন যাপনে মনোযোগী হন। আর যখন স্বজন লাপাত্তা হয়ে যান? গুমের স্বীকার হন? তখনকার চিত্রপটটা আর এমন স্বাভাবিক থাকে না।
এটা ঠিক কারো জন্যে কিছু থেমে থাকে না। একজন মানুষের মৃত্যু মানে হল একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। তখন তাকে বাদ দিয়েই তার স্বজনরা আগামীর জীবন সাজান। গোলটা বাধে, যখন স্বজনেরা জানতে পারেন না যে, তাদের স্বজন জীবিত না মৃত। মৃত্যুর শোক সহ্য করা যায় কিন্তু স্বজনের হারিয়ে যাওয়ার বিরহ সওয়া অসম্ভব। স্বজন কোথায় আছে, কিভাবে আছে এই উৎকণ্ঠা তার পরিবারকে আর কখনোই স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দেয় না। একদিকে স্বজন হারানোর শোক অন্যদিকে তার ফেলে যাওয়া সম্পদের ভোগ দখল এবং বিক্রি বণ্টনে জটিলতা ভুক্তভোগী পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দারুণভাবে ব্যাহত করে। কোন কোন ক্ষেত্রে অর্থ সম্পদ থাকা স্বত্বেও পরিবারটিকে নিঃস্ব করে ফেলে।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমন কি বছরের পর বছর ধরে গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তির স্বজনেরা অপেক্ষায় থাকেন। নির্ঘুম রাত কাটান। প্রশাসনের দারে দারে ঘুরে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পরেন। কেউ দায় নেয় না; কেউ এদের উদ্ধারে তৎপরতা দেখায় না। মানুষগুলো তখন কি নিয়ে বাঁচে?
রাষ্ট্রের কাছে তার নাগরিকদের প্রথম যে দাবিটা থাকে তা হল নিরাপত্তা। রাষ্ট্র যখন তা দিতে ব্যর্থ হয় তখন সে রাষ্ট্রকে কি সফল বলার উপায় থাকে? আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেব অনুযায়ী শুধুমাত্র গত বছরেই গুমের স্বীকার হয়েছেন ৯১ জন মানুষ। ৩১ ডিসেম্বর,২০১৭ ইত্তেফাকে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) রিপোর্ট অনুযায়ী, বছর জুড়ে রহস্যময় গুম ৯১ জন। ফিরেছেন ২৬ জন, সন্ধান নেই ৬৫ জনের।
ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০১৭ সালে দেশে “আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ,গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হন ৬০জন। এর মধ্যে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়,আটজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়, পরিবারের কাছে ফেরত আসে সাতজন। বাকি ৪৩জনের খোঁজ মেলেনি এখনও। এছাড়া ‘রহস্যজনক’ নিখোঁজের সংখ্যা আরও ৩১ বলে জানিয়েছে আসক। তাদের মধ্যে ৯জন ফেরত এলেও তাদের ছয়জনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী,পরিবারে ফিরেছেন তিনজন।
সাধারণ মানুষ উৎকণ্ঠিত এই ভেবে যে রাষ্ট্র কি করছে? একই সাথে তারা আরও বেশি শঙ্কিত এই জন্য যে, এ প্রসঙ্গে প্রথমেই তিরটি ছুড়ে দেয়া হয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে। যার প্রধান কারণ হল, প্রথমত এদেরকে অপহরণ করাই হয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে। দ্বিতীয়ত, অপহরণের কিছুদিন পরে অনেককে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার দেখিয়েছে। কাজেই সন্দেহটা তো অমূলক নয়।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার্থে সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় আনবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে জন্যে লুকোচুরি কেন? যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এর মধ্যে কিছু মানুষকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যেয়েও থাকে তাদের নাম করে অন্য কোন সংগঠন যে বাঁকিদের গুম করে নি তার নিশ্চয়তা কি? ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে না পারার দায়ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেই নিতে হবে।
পুলিশ যদি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সাদা পোশাকে গ্রেফতার অভিযানে যাওয়া বন্ধ করত তাহলে তো আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে কাউকে তুলে নেয়ার সুযোগ থাকত না।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, “উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাউকে আটকের পর এক ঘণ্টার মধ্যেই টেলিফোনে কিংবা বিশেষ বার্তা বাহকের মাধ্যমে তার নিকটাত্মীয়কে জানানোর কথা। এছাড়া ৩ ঘণ্টার মধ্যেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে গ্রেফতারের বিষয়টি জানানো, পছন্দসই আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে দেয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকে গ্রেফতার অভিযানে না যাওয়া এবং কাউকে গ্রেফতারের সময় সংস্থার প্রকৃত পরিচয় দেয়াসহ ১৫ দফা নির্দেশনা রয়েছে উচ্চ আদালতের। ওই নির্দেশনার মধ্যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।”যুগান্তর১৩ জুন,২০১৬
প্রশ্ন হল পুলিশ কি সব ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা মেনে চলছে? যদি চলত তাহলে কিন্তু তারা জনসাধারণকে সতর্ক করে দিতে পারত। জনসাধারণ যদি জানত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কখনোই সাদা পোশাকে গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করে না তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার চারপাশের মানুষই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত। এখন তো সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যদি সাদা পোশাকে গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা বন্ধ করত তাহলে তারা এই অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিবাদ করত। আমরা তো সেটাও দেখতে পাই নি। এতে করে যে পুলিশকে সাধারণ মানুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে দার করিয়ে দেয়া হচ্ছে সেটা কি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কখনো ভেবে দেখেছে?
যদিও রাজনৈতিক বাক বিতণ্ডায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলকে গুম ও গুপ্ত হত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু সেটা তো প্রমাণিত হয় নি। সর্বোপরি এই গুম এবং গুপ্তহত্যার রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব পুলিশ প্রশাসনের। সাধারণ মানুষ চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে, এটা তো ঠিক। এ থেকে বের করে আনার দায়িত্ব সরকারের। যে বা যারাই দায়ী হোন না কেন তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক। এক কথায় গুম ও গুপ্ত হত্যা অনতিবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
একটু বিশেষ ভাবে লক্ষ করলে দেখা যায় এ পর্যন্ত যারাই গুমের স্বীকার হয়েছেন তাদের মধ্যে দু একজন উচ্চ মধ্যবিত্ত হলেও বাকি প্রায় সকলেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। এই গুম যদি অর্থনৈতিক কারণে হত তাহলে নিশ্চয়ই সবার আগে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষ আক্রান্ত হতেন (যদিও সেটা কাম্য নয়) । তা কিন্তু হচ্ছে না। এমন কি ফিরে আসাদের কেউ বলছেন না যে অর্থের বিনিময়ে ফেরত এসেছেন। আরেকটা ভয়াবহ বিষয় হল, তারা কেউ ভয়ে মুখ খুলছে না। অর্থাৎ রাষ্ট্র তাদের ভীতি দূর করতে পারছে না অথবা করছে না। তাহলে তো এ প্রশ্ন এসেই যায় রাষ্ট্রের থেকেও শক্তিশালী রাষ্ট্রের মধ্যে কারা থাকতে পারে। এর উত্তরও রাষ্ট্রকেই খুঁজে বের করতে হবে।
বাংলাদেশ পুলিশ সম্পর্কে সাধারণের মাঝে একটি প্রশংসা বাক্য সব সময় লক্ষ করা যায় আর তা হল ‘পুলিশ পারে না এমন কোন কাজ নেই’(ইতিবাচক অর্থে)। এই আস্থা এমনি এমনি তৈরি হয়নি পুলিশের সফলতাই এর মূলে। যখনই রাজনৈতিক ভাবে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তখনই তা সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন করে এ দেশের পুলিশ প্রশাসন নিজেদের সক্ষমতা পরিচয় দিয়েছে। সেটা শীর্ষ সন্ত্রাসী ধরার ক্ষেত্রে বলুন আর রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করার ক্ষেত্রে বলুন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্যের সবথেকে বড় উদাহরণ হতে পারে জঙ্গিবাদ দমন। এ ছাড়াও পুলিশ প্রশাসনের সফলতার উদাহরণ দিতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, দর্জি দোকানী বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার আসামীদের আইনের আওতায় আনা সহ আছে অসংখ্য সাফল্য গাথা। ব্যর্থতা যে নেই তা নয় তবে সে ক্ষেত্রেও সন্দেহের তীরটা ঐ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকেই গিয়ে পরে।
সমস্যা হল প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলেই যেমন পুলিশের নাকের ডগায় জেএমবি জন্মেছিল। দিনের পর দিন অরাজকতা সৃষ্টি করতে পেরেছিল ঠিক তেমনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলেই পরবর্তীতে তারা গ্রেফতার হয়েছিল। সবটাই এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই। আবার বর্তমান সময়েও যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হল, “আমরা জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেব না” তখন এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দারাই তাদের দমন সম্ভব হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, অনেক উন্নত দেশের তুলনায় এ দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সফলতার সাথে জঙ্গিবাদ দমনে সক্ষম হয়েছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার যে অভিযোগ করা হয় তার পেছনে পুলিশের কিছু সদস্যের অনৈতিক কর্মকাণ্ড অবশ্যই দায়ী। তবে এর সাথে আরও একটা বিষয় আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিৎ তা হল, ষোল কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র এক লক্ষ একচল্লিশ হাজার সদস্য নিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তার উপরে আবার রয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। যার উপর নির্ভর করে তারা কখন কোন বিষয়ে ফোকাস করবে। অতএব দেশব্যাপী গুম গুপ্তহত্যার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তা থেকে বেড়িয়ে আসতে হলেও সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমরা বিশ্বাস করি সরকার যদি চায় গুম গুপ্তহত্যার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে। তাহলে আমাদের এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পারবে খুব দ্রুত এর সমাধান করতে। বর্তমান সরকারের কি সেই বোধোদয় হবে যে, অনতিবিলম্বে জঙ্গিবাদ দমনের মতই গুম গুপ্তহত্যা বন্ধ করা জরুরী। সরকারের উচিৎ উন্নয়নের পাশাপাশি জন মানুষে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
দ্রুতই এসব অপহৃত বা নিখোঁজের ঘটনার সঠিক তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় না আনতে পারলে ভবিষ্যতে যে এর ফলাফল আরও ভয়াবহ হবে সেটা সহজেই অনুমেয়। একদিকে যেমন তা আওয়ামী সরকারকে কালিমালিপ্ত করতে থাকবে অন্যদিকে দেশকে নিয়ে যাবে আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে।

kmgmehadi@gmail.com




মোঃ গালিব মেহেদী খাঁন অতি সাধারনের একজন। সাধারন মানুষের কথা বলি।
ব্লগ লিখছেন ৫ বছর ০ মাস ২৫ দিন, মোট পোষ্ট ২৬৫টি, মন্তব্য করেছেন ৮০টি,          



এই ধরনের আরো কিছু পোস্ট.


ব্লু হোয়েল গেম এবং অভিভাবকদের উদাসীনতা

রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমাদের সুদূরপ্রসারী চিন্তা করা উচিৎ।

দায়িত্বপ্রাপ্ত গন দায়িত্বশীল আচরণ করছেন না।

ভালোলাগা আর ভালোবাসা এক নয়

বাবা-মেয়ের আত্মহত্যা এই সমাজ ব্যবস্থার গালে সজোরে চপেটাঘাত
 

মন্তব্য সমূহঃ

মন্তব্য করতে লগিন করুন।

ইমেইল: পাসওয়ার্ড: রেজিস্ট্রেশন করুন